তীক্ষ ও সংক্ষিপ্ত মন্দার পদধ্বনি?

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২০, ২১:৪৯

এমনিতেই গত দেড় মাস ধরিয়া করোনা ভাইরাসের লাগামহীন দৌরাত্ম্য বিশ্ব অর্থনীতিকে টানিয়া নিচে নামাইতেছিল, তাহার উপর গত বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে ‘প্যানডেমিক’ অর্থাত্ মহামারি ঘোষণা করিবার পরপরই অতিবেগে ধস নামিল বিশ্বের শেয়ারবাজারে। সিএনএন এই ব্যাপারে বিশেষ একটি পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করিয়াছে, যেইখানে বলা হইতেছে, বিশ্ব অতি দ্রুত একটি ‘তীক্ষ তবে সম্ভবত সংক্ষিপ্ত মন্দা’র দিকে ধাবিত হইতেছে। বত্সরের প্রথমার্ধেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মন্দার একটি ‘সম্ভাবনার’ দিকে অগ্রসর হইতেছে। যদিও আশা করা হইতেছে, কভিড-১৯ যদি দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত না থাকে, তাহা হইলে এই বত্সরের দ্বিতীয়ার্ধেই এই মন্দার পুনরুদ্ধার সম্ভব হইবে। তবে অর্থনীতিটির জন্য সবচাইতে খারাপ অবস্থা আসিতে এখনো পরবর্তী কয়েক মাস অপেক্ষা করিতে হইবে। অর্থাত্ এই সময়ের মধ্যে করোনাকে কতখানি তীব্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়, তাহার উপর নির্ভর করিতেছে মন্দার মেয়াদ ও প্রভাব। এই বিশ্বায়নের যুগে প্রত্যেক দেশের মধ্যে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। ২০১৩ সালে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বযুদ্ধের সমতুল্য হইতেছে মহামারি।  করোনা ভাইরাস যেন সারা বিশ্বের সেই যুদ্ধ ছড়াইয়া দিল! এই মহামারির কারণে বিশ্বে মোট জিডিপির ৫ শতাংশের কাছাকাছি বা ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হইতে পারে।

ইউরোপ ইউনিয়নভুক্ত সকল দেশে করোনা ছড়াইয়া যাইবার পর তাহাদের সহিত সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়াছে, ইউরোপের দেশগুলির সহিত বাণিজ্যও বন্ধ করিয়া দিতে পারে আমেরিকা। বাস্তবিক অর্থে গত পাঁচ বত্সর পূর্বে শরণার্থী সংকটের চাইতেও ভয়াবহ হিসাবে করোনাকে ইউরোপে বিবেচনা করা হইতেছে। বাতিল করা হইতেছে সকল আন্তর্জাতিক ব্যাবসায়িক সম্মেলন। আইটিবি পর্যটন বাণিজ্য মেলা, জেনেভায় মোটর শো, ফেসবুকের বার্ষিক সম্মেলন, ওয়ার্ল্ড মোবাইল কোম্পানি বাতিল করা হইয়াছে। ভারত ছিন্ন করিয়াছে সারাবিশ্বের সহিত সম্পর্ক, ভ্রমণ ভিসা স্থগিতের মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতেও চলিতেছে নানান ধারায় কড়াকড়ি। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও পর্যটকদের সংখ্যা কমিয়া যাইবার কারণে প্রায় ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হইবে বলিয়া জানাইয়াছে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা আইএটিএ। এমতাবস্থায় অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করিতেছেন, করোনার ভয়াবহতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকিলে বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলি কর্মী ছাঁটাই শুরু করিতে পারে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের একটি প্রতিবেদন বলিতেছে, চীন হইতে যদি সারাবিশ্বে কাঁচামাল রপ্তানি ২ শতাংশও কমিয়া যায়, তাহা হইলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতি হইবে ৫০ বিলিয়ন ডলার। আর বাংলাদেশের ক্ষতি হইবে ১ কোটি ৭০ লক্ষ ডলার। ইহার মধ্যে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হইবে সবচাইতে বেশি। করোনার ক্ষতি হইতে পুনরুদ্ধারে প্রাথমিকভাবে চীন সুদের হার কমাইয়াছে। ইতোমধ্যে চীনের পথে হাঁটতে শুরু করিয়াছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। আমাদের দেশেও শিল্পকারখানায় বিনিয়োগকারী ঋণগ্রহীতারা যাহাতে এই আসন্ন তীক্ষ মন্দার কবলে পড়িয়া মহাসংকটে না পড়েন, তাহার জন্য বিশ্বের বড়ো বড়ো দেশের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।