দেশের তাঁত শিল্প রক্ষা ও প্রান্তিক পর্যায়ের তাঁতিদের সুবিধা দিতে সরকার নামমাত্র শুল্কে সুতা আমদানির সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এ সুবিধার যথেচ্ছ অপব্যবহার হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, তাঁতি সমিতির আওতাধীন তাঁতের সংখ্যার চাইতেও বেশি সংখ্যক তাঁত দেখিয়ে সুতা আমদানি করা হয়। অস্তিত্বহীন তাঁতি সমিতির নামেও আমদানি হচ্ছে সুতা। মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকৃত এসব সুতার বড়ো অংশই খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। রেয়াতি শুল্ক সুবিধায় আনা এসব সুতা চোরাই পথে বিক্রির বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে নরসিংদীর মাধবদী, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নারায়ণগঞ্জে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তাঁতি সমিতিগুলোর আওতাধীন সদস্যদের যে পরিমাণ তাঁত রয়েছে, তার চেয়ে বেশি তাঁত দেখিয়ে সুতা আমদানির জন্য তাঁত বোর্ডের কাছে আবেদন জমা দেওয়া হয়। যথাযথ পরীক্ষা করে অনুমোদন দেওয়ার কথা থাকলেও তা হয় না। অন্যদিকে এসব সুতার যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় ভ্যাট অফিসের দায়িত্ব থাকলেও তা হচ্ছে না। বরং সমিতিগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমদানির অনুমোদন দেওয়ায় মিথ্যা ঘোষণায় বিপুল সুতা দেশে প্রবেশ করে স্থানীয় সুতার বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোন কোন তাঁতি সমিতির নামে ১৪ কোটি টাকার সুতা আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে। বাস্তবে প্রান্তিক পর্যায়ের তাঁতি সমিতিগুলোর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় এত টাকার সুতা আনতে পারার কথা নয়। আবার কোন কোন সমিতি সুতার দাম অস্বাভাবিক কম দেখিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত সক্ষমতার চেয়ে বেশি সুতা আমদানির মাধ্যমে একদিকে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে এসব সুতা অবৈধ উপায়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।
টেক্সটাইল মিল মালিকদের দাবি, এর ফলে স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলো মার খাচ্ছে। কেননা স্বল্প শুল্কে আমদানিকৃত এসব সুতা খোলাবাজারে বিক্রি হওয়ায় বিশাল অর্থ বিনিয়োগকারী স্থানীয় মিলগুলো মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে অনেকেরই সুতা অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নিজেদের উদ্বেগ জানিয়ে সম্প্রতি টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, আমদানিকৃত সুতা তাঁতের কাজে ব্যবহার না হয়ে খোলাবাজারে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকারক তাঁত প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায় না কিংবা মিথ্যা ঘোষণায় সুতা আমদানি করা হয়। এ পরিস্থিতিতে আমদানিকারক তাঁত প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ও উত্পাদন সক্ষমতা যাচাই করার পাশাপাশি বার্ষিক উত্পাদনের বিপরীতে কী পরিমাণ সুতা আমদানি হচ্ছে, তা তদারকির দাবি জানানো হয়।
সূত্র জানিয়েছে, সরকারের দেওয়া সুবিধা প্রান্তিক তাঁতিদের পকেটে না গেলেও কিছু অসাধু আমদানিকারকের পকেট ঠিকই ভারী হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, তাঁতি সমিতির লাইসেন্স ব্যবহার করে রেয়াতি সুবিধায় (৫ শতাংশ শুল্ক) সুতা আমদানি করে তা খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। অথচ বাণিজ্যিক আমদানিতে এসব সুতার শুল্ককর ৫০ শতাংশের ওপরে।
বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন ইত্তেফাককে বলেন, ছয় ডলার মূল্যের এক কেজি পলিয়েস্টার সুতার আমদানি মূল্য দেখানো হচ্ছে এক ডলার। মূলত মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, আমদানিকারকদের বেশির ভাগই ভুয়া সমিতি। আবার কিছু তাঁতি থাকলেও সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি সুতা আমদানি করছে। এসব আমদানিকারকদের বিল অব এন্ট্রি পরীক্ষা করলে এর সত্যতা পাওয়া যাবে। এসব কারণে স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলো ক্ষতির শিকার হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব আমদানির যথাযথ তদন্ত করে দায়ীদের আওতায় আনা দরকার।
অবশ্য তাঁতি সমিতির নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করছেন। বাংলাদেশ জাতীয় তাঁতি সমিতির সভাপতি মো. মনোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, সরকার তাঁতিদের জন্য যে সুবিধা দিয়েছে, তাতে গরিব তাঁতিরা উপকৃত হচ্ছে। যে পরিমাণ সুতা আমদানির কথা বলা হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তা নয়। গত দুই বছরে ৪০০ কোটি টাকার সুতা আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক সুতা আমদানি হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. শাহ আলম ইত্তেফাককে বলেন, তাঁতিরা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশ। তারা যেন প্রাপ্য সুবিধা ভোগ করতে পারে, এজন্য সকলকে সচেতন হতে হবে।
সিরাজগঞ্জে অবৈধ সুতা আটক: এদিকে গতকাল সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৭৫০ কেজি অবৈধ সুতা আটক করেছে এনবিআরের বিশেষ টাস্কফোর্স। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শাহজাদপুরে অবস্থিত সরকার ট্রেডার্সের দোকান ও গুদামে অভিযান চালিয়ে এসব সুতা আটক করা হয়। শুল্ককরসহ এসব সুতার বাজারমূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা।
টাস্কফোর্সের সভাপতি ও কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার এস এম হুমায়ূন কবীর ইত্তেফাককে বলেন, আটককৃত এসব সুতা বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
