এম এ মাসুম
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অবদান অপরিসীম। আশার কথা হচ্ছে, দেশীয় অঙ্গনের আর্থিক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এ কারণে বাড়ছে নারীদের ব্যাংক হিসাব। যা নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশগ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে নারীর ক্ষমতায়ন যেমন বাড়ছে, তেমনি সমাজে নারীর প্রভাবও বাড়ছে। বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে কর্মসংস্থানে নারীদের মজুরি বৈষম্য কমে আসতে শুরু করেছে। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানেই পুরুষের সমান মজুরি পাচ্ছেন নারীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা অর্থনীতির বৃহত্তর এই তিন খাতে কাজ করছেন। অর্থনীতিতে নারীর আরেকটি বড়ো সাফল্য হলো—দেশের সামগ্রিক উত্পাদন ব্যবস্থায় নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ। বর্তমানে জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশের কিছুটা বেশি। কিন্তু বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অবদান স্বীকার করলে এই হার দাঁড়ায় ৪০ শতাংশের ঊর্ধ্বে।
অর্থনীতির অন্যতম রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে ৫০ লাখ ১৫ হাজার নারী-পুরুষ কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে নারী ২২ লাখ ১৭ হাজার। তাছাড়া, কৃষি, হাস-মুরগি, মত্স্য খামার, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তা, আইটি সংশ্লিষ্ট খাতে আউট সোর্সিংসহ যাবতীয় কাজে সম্পৃক্ত নারীরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। রপ্তানিমুখী শিল্পে নারী শ্রমিকের চাহিদা ও অংশগ্রহণ সর্বাধিক। তৈরি পোশাক শিল্প, হিমায়িত চিংড়ি, চামড়া, হস্ত শিল্পজাত দ্রব্য, চা এরকম রপ্তানি আয়ের ৭৫ ভাগ অর্জনকারী শিল্পের মূল চালিকাশক্তিই হচ্ছে নারী। সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, গৃহস্থালিতে নারীর যে কাজ জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না সেই শ্রমের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য (২০১৩-১৪ অর্থবছর) জিডিপির ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অবশ্য গৃহস্থালি কাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, যার আর্থিক মূল্যমান ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। জিডিপিতে এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে নারীর হিস্যা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের নারীরা। দেশের কৃষি আর গৃহে নারীরা দৈনন্দিন যে কাজ করে তার অবদান অসামান্য হলে এর স্বীকৃতি নেই। জিডিপিতেও এই অবদান উল্লেখ করা হয় না। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড়ো অবদান রেখে চলেছেন প্রবাসে কর্মরত নারী কর্মীরা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৯ লাখের বেশি নারী কর্মী গমন করেছে। তাদের নিজস্ব আয় দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানো, সঞ্চয় বৃদ্ধি করাসহ পারিবারিক নানা উন্নয়ন কাজকর্ম করতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটা গতি সঞ্চার হয়েছে। সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। পিছিয়ে নেই ব্যাংক খাতও। এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকলেও ধীরে ধীরে ব্যাংকে নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। দেশে বর্তমানে ২২ হাজারেরও বেশি অর্থাত্ প্রায় ১৮ শতাংশ নারী ব্যাংক খাতে চাকরি করছেন। যদিও এ খাতে উচ্চপদে অর্থাত্ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে নারী এখনো হাতে গোনা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। তবে ধীরে ধীরে দেশের সব ক্ষেত্রেই নারী কর্মীদের সংখ্যা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট জনবল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৭৫ জন। এর মধ্যে নারী কর্মী ২৫ হাজার ৭৭১ জন। এর মানে ব্যাংকিং পেশায় নারীর অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। ২০ বছর আগে এর অর্ধেকেরও কম ছিল। এখন ব্যাংকগুলোতে ৩০ বছরের কম বয়সি যেসব কর্মী আছেন তাদের মধ্যে ২০ দশমিক ৯১ শতাংশ নারী। ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সি কর্মীর মধ্যে নারীর হার ১৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ৫০ বছরের বেশি বয়সির মধ্যে এ হার বেড়ে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ২২ শতাংশ নারী কর্মী আছেন বিদেশি ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকের ৩ হাজার ৮৭৩ কর্মীর মধ্যে নারী আছেন ৯৩৮ জন। নারীরা শুধু ব্যাংকের চাকরিতে আসছেন তা নয়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরি, কৃষি, ব্যবসায় উদ্যোগসহ নানা ক্ষেত্রে তাদের সফল অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর হয়রানি বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ, মাতৃত্বকালীন ছুটির নিশ্চয়তা, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন, ব্যবসার জন্য কম সুদের ঋণসহ নানা কারণে নারীরা বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নারীদের অবদানকে স্বীকার করে নিয়ে সমাজ বিনির্মাণ ও জাতির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে তাদের আরো বেশি অংশগ্রহণ এবং সম্পৃক্ততায় এগিয়ে যাবে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায়। ছবি : ইন্টারনেট
