চিররঞ্জন সরকার
করোনা ভাইরাসের কারণে এখন দেশ জুড়ে চলছে আতঙ্ক আর হুজুগ। ইতালিফেরত দুই ব্যক্তি এবং তাদের এক আত্মীয়ার শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার সরকারি ঘোষণার পর মুখোশে ঢাকা পড়েছে নগরবাসীর মুখ। ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কাকে দূর করতে মাস্ক (মুখোশ) কেনার হিড়িক পড়েছে। সবখানে যত না আতঙ্ক, তারও বেশি পূর্বপ্রস্তুতির এই তাড়নায় মাস্কের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে শহর জুড়ে। দেশে করোনা আক্রান্তের খবর প্রকাশের পর থেকেই জীবাণুনাশক ও সমজাতীয় পণ্য কিনতে শুরু করে মানুষ। এতে জীবাণুনাশকেরও সংকট দেখা দেয়। বাড়তি চাহিদার সুযোগে দামও বাড়িয়ে দেয় বিক্রেতারা। এ পরিস্থিতিতে জীবাণু প্রতিরোধী পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে বাধ্য হয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
এরই নাম বুঝি হুজুগ। বাঙালির হুজুগ! কোনো একটি ঘটনা ঘটেছে কি না, ঘটলেও আসলে কী ঘটেছে, এর প্রভাব কী, প্রকৃত করণীয় কী—এসব নিশ্চিত না হয়ে একটু আভাস পেলেই তুলকালাম ঘটিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালির জুড়ি নেই। এখানে বলে রাখা ভালো, হুজুগের সঙ্গে গুজবেও আমাদের দেশের মানুষ বড়ো বেশি আস্থাশীল। অনেকে এ কথাও বলেন, হুজুগে বাঙালির কান-খাড়া গুজবে! ‘গুজবে কান দেবেন না’—এ কথা বলার পরেও দেখা যায়, গুজব কিন্তু কানে কানে, মনে মনে এমনকি মুখে মুখে ফেরে। আর এর গতি যে আলোর গতির চেয়েও নেহাত কম নয় এ ভুক্তভোগী মাত্রই জানে। আপনি যতই সতর্কভাবে গুজব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন না কেন, গুজব কিন্তু আপনার পেছন ছাড়বে না। আর গুজবে কান না দিয়ে থাকবেনই বা কী করে, যদি শোনেন সেই কানই নিয়ে গেছে চিলে, আর এমন গুজব শুনেও ছুটতে থাকবেন চিলের পেছনে!
গুজব ছড়ানোয় বাঙালির মতো ওস্তাদ পৃথিবীতে মেলা ভার। বাঙালি গুজব ছড়িয়ে তিলকে তাল বানিয়ে ফেলতে পারে মুহূর্তের মধ্যে। আসলে গুজব ছড়িয়ে বাঙালিকে খুব সহজেই কাবু করা যায়। একটা গুজব রটাতে পারলে সবাই গুজবের পেছনে ছুটতে থাকবে। গুজব সত্যি কি না, তা পরখ করার শ্রমটুকু স্বীকার করতেও অপারগ। ফলে গুজবকে ঢাল করে সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানীরা মানুষকে বোকা বানায় নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। গুজবের পেছনে ছুটে চলা, হুজুগে মাতোয়ারা হওয়ার মধ্যেই যেন আমাদের যাবতীয় শান্তি-স্বস্তি-সিদ্ধি। সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে গুজব এখন হাতে হাতে তৈরি হচ্ছে, ঘুরছে পকেটে পকেটে। বাঙালির সব রকম আশা-ভরসা আর হতাশা চর্চার লীলাভূমি এখন ফেসবুক। ডিজিটাল যুগে এসে যাবতীয় উত্তেজনা সবাই ঢেলে দিচ্ছে ফেসবুকে।
এরই মধ্যে ফেসবুকে শুরু হয়ে গেছে করোনা ভাইরাস নিয়ে নানা সত্য-অর্ধসত্য, মিথ্যা, ভুয়া, মনগড়া সব অপতথ্য প্রকাশের প্রতিযোগিতা। এ যেন জীবন-মরণ লড়াই। কে কাকে টেক্কা দিতে পারে, কে কার চেয়ে বেশি জানে, কে নতুন ও চমকপ্রদ তথ্য সরবরাহ করতে পারে তার লড়াই। এর শুরু আছে শেষ নেই।
ঢাকা শহরে এখন মানুষ চেনা কঠিন হয়ে গেছে। বেশিরভাগ মানুষ মাস্ক পরে ঘুরছেন। নানা বর্ণের, নানা আকারের, নানা সাইজের বিচিত্র সব মাস্ক। এসব মাস্ক পরার পর কাউকে উল্লুক, কাউকে ভল্লুক, কাউকে শকুনের মতো দেখাচ্ছে। কিন্তু এসব নিয়ে কারো কোনো বিকার নেই।
এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে কে বা কারা যেন রটিয়েছে যে, মাস্ক পরলে করোনা ভাইরাস ঠেকানো যাবে। আর যায় কোথায়? সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মাস্কের ওপর। আর কথায় আছে, কারো সর্বনাশ তো কারো পৌষ মাস। মাস্ক বিক্রেতারা রাতারাতি মাস্কের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তার পরও মাস্ক কেনার উত্সব বন্ধ হয়নি। বন্ধ হবেই বা কেন? সবাই প্রাণপণ চেষ্টা করছেন বাঁচার জন্য! এই সুন্দর ভুবনে কে-ই বা মরতে চায়?
পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, সবাই সব খবর রাখছে। তারপরও একটাই কথা : যদি আক্রান্ত হই তখন কি হবে? সবাই এটাও জানে যে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া মানেই মৃত্যু নয়। আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা দেড় থেকে দুই ভাগ মানুষ এখন পর্যন্ত মারা গেছে। ৯৬ থেকে ৯৮ ভাগ মানুষ সুস্থ হয়েছে। কিন্তু সবারই উদ্বেগ হচ্ছে, সেই ‘দেড় থেকে দুই ভাগের’ মধ্যে যদি আমি পড়ে যাই!
বাঁচতে চাওয়া, বাঁচার জন্য নানা রকম উপায় অবলম্বন করা, সাবধান হওয়া—এটা অবশ্য দোষের না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, করোনা থেকে বাঁচতে, রেহাই পেতে যে উপায়গুলো বেছে নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো কতটুকু কার্যকর? আদৌ এসবের দরকার আছে কি?
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে মাস্ক কতটুকু ভূমিকা পালন করে বা করতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সম্প্রতি বিবিসি একটি প্রতিবেদন ছেপেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচতে সকলেই মাস্ক পরে ঘোরার ওপর জোর দিচ্ছেন। কিন্তু তা না করে বরং সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দেওয়া হোক। এই উপদেশ দিয়েছেন ইউএস সার্জেন জেনারেল ডা. জেরম অ্যাডামস। তিনি আরো বলেছেন, মাস্ক পরে করোনা ভাইরাস আটকানো যাবে না। বরং এত মাস্ক বিক্রি হয়ে গেলে স্বাস্থ্যকর্মীরাই বিপদে পড়বেন। সংক্রমিত রোগীদের চিকিত্সা করার সময় সুরক্ষা নিতে পারবেন না।
বায়ুবাহিত ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এই মাস্ক কতটা কার্যকর সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয়ে আছেন ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা, যাদেরকে বলা হয় ভাইরোলজিস্ট। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে সেন্ট জর্জেসের ড. ডেভিড ক্যারিংটন জানান, ‘সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক বায়ুবাহিত ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে যথেষ্ট নয়। বেশির ভাগ ভাইরাসই বায়ুবাহিত এবং এই মাস্কগুলো এতই ঢিলেঢালা থাকে যে এটা বায়ুকে ভালোভাবে ফিল্টার করতে পারে না। তাছাড়া যিনি এই মাস্ক ব্যবহার করছেন, তার চোখও উন্মুক্ত থাকছে।’
কুইন্স ইউনিভার্সিটি অব বেলফাস্টের ওয়েলকাম-উলফসন ইনস্টিটিউট ফর এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিনের ড. কনর বামফোর্ড বলেছেন, সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেই ছোঁয়াচে ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে কার্যকরভাবে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। তিনি আরো বলেছেন, ‘যখন হাঁচি দিচ্ছেন তখন মুখটি ঢাকুন, তারপর হাতটি ধুয়ে নিন এবং ধোয়ার আগ পর্যন্ত মুখের ভেতরে হাত দেবেন না। শুধু এতেই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ানো ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে।’
পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের ড. জেক ডানিং বলেছেন, ‘যদিও একটি ধারণা আছে যে মাস্ক ব্যবহার করা উপকারী, কিন্তু বাস্তবে হাসপাতালের পরিবেশের বাইরে এই মাস্ক ব্যবহারের ব্যাপকভিত্তিক উপকার পাওয়ার খুব কম নজিরই আছে। মাস্ক যদি পরতেই হয় এবং এটা থেকে উপকার পেতে হয়, তবে সেটা পরতে হবে সঠিকভাবে। বদলাতে হবে নিয়মিত এবং এগুলো যেখানে-সেখানে ফেলা যাবে না, এক্ষেত্রেও নিরাপত্তা নির্দেশিকা মানতে হবে। একই মাস্ক ঘরে রেখে দিয়ে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা উচিত নয়। নিয়ম হলো, একটি মাস্ক সর্বোচ্চ এক দিন ব্যবহার করে সেটাকে ধ্বংস করে দিতে হবে।
তবে হ্যাঁ, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি বা আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সংস্পর্শে আসা কেউ, এদের অবশ্যই ‘মাস্ক’ পরা উচিত, যাতে রোগটা না ছড়ায়। এই রোগের চিকিত্সার সঙ্গে যুক্ত সকলেরও ‘মাস্ক’ পরে থাকা উচিত। তবে এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের পক্ষে ‘মাস্ক’ পরাটা অবশ্যকর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। তাছাড়া ‘মাস্ক’ পরার কিছু কুফলও রয়েছে। অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত, এমন ব্যক্তি ‘মাস্ক’ পরলে হিতে বিপরীত হতে পারে। কিন্তু আমরা এসব অভিমত পাঠ করছি না। করলেও তা মানছি না। আমরা ভেসে চলেছি গুজবে, হুজুগে, নিজের মনগড়া বিশ্বাসে। আমরা আপাতত মুখঢাকা মুখোশের মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করে করোনা নামক আপদের হাত থেকে পরিত্রাণ চাইছি!
পুনশ্চ :
আমার এক মাইক্রো-বায়োলজিস্ট বন্ধু করোনা নিয়ে মজার কিন্তু শিক্ষণীয় কিছু উপদেশ দিয়েছেন। এই উপদেশাবলিকে তিনি ‘পোস্ট-করোনা যুগের সম্ভাষণ রীতি’ নাম দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন : ‘নো হ্যান্ডশেক, নো কোলাকুলি বা আলিঙ্গন, নো চুমো। তিন হাত দূর থেকে মিষ্টি হাসি, সালাম বা নমস্কার দিন। তাতেও মন না ভরলে খটাস করে একটা স্যালুটও ঠুকে দিতে পারেন!
আর জ্বর, সর্দি, কাশি হলে জাতির স্বার্থে একদম অসামাজিক হয়ে যান। কেউ কাছে এলেই নাক-মুখ ঢেকে দূর হতে বলুন! স্কুল, কলেজ, অফিস ফাঁকি দিন। ঘরে বসে আদা, লেবু, মধু চা খান। ভিটামিন ‘সি’ খান, ফলের রস খান, কুসুম গরম পানি খান, জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল খান। মোটকথা ঠান্ডা জ্বর লাগলে যা যা করেন তাই করুন। তবে এসবের কোনোটাই করোনা ভাইরাস ইনফেকশনের সরাসরি চিকিত্সা নয়। এসব হয়তো আপনাকে সাময়িক উপশম দেবে। কিন্তু আসল কাজটি করবে আপনার শরীর। আপনার শরীরের রয়েছে রোগ প্রতিরোধ করার জন্য ইমিউন সিস্টেম যা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে আপনাকে ক্রমশই সুস্থ করে তুলবে। কিন্তু তা না হয়ে উচ্চমাত্রার জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখলে ডাক্তারের সাহায্য নিন, হাসপাতালে চিকিত্সা নিন।
অসামাজিক হতে গিয়ে কেউ মন খারাপ করলে অসুবিধা নেই। সংকট কাটলে চা-কফি বা দাওয়াত খাইয়ে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা যাবে নিশ্চিত!
n লেখক : রম্য রচয়িতা
