সবাইকে সৃজনশীল হতে হবে

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২০, ২২:২৭

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

প্রতিটি মানুষের মধ্যে সৃজনশীল চিন্তা গড়ে তোলা দরকার। সেটি যে কোনো বিষয়ে হতে পারে। আমরা অনেক সময় মনে করি, গবেষণা ও উদ্ভাবন কেবল বিজ্ঞানচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এটি আমাদের সাধারণ মানুষের একটি ভ্রান্ত ধারণা। সৃজনশীলতা কেবল বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্যে আবদ্ধ নয় বরং এটি যে কোনো বিষয় ও ভাবনার ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। আবার এই বিষয় ও ভাবনাগুলো কোনো না কোনোভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যিনি মন নিয়ে ভাবছেন, তিনি মনোগত সৃজনশীল ধারণার জন্ম দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। যিনি রাষ্ট্র নিয়ে ভাববেন, তিনি রাষ্ট্রের উন্নয়নের সৃজনশীল ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হবেন। অর্থনীতি নিয়ে যিনি ভাববেন, তিনি অর্থনীতির নতুন নতুন থিওরি উদ্ভাবন করে মানুষের বর্তমান ধারণাকে পালটাবেন। এমনিভাবে দর্শন, রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বিজ্ঞান ও কলার যে কোনো বিষয় ও ভাবনা সৃজনশীল হতে পারে। একজন সাধারণ মানুষ, যার এই বিষয়গুলোর কোনোটিতেই ধারণা নেই, তিনিও তার মতো করে ভাববেন, ভাবাবেন। এমন ধরনের চিন্তার গতিশীলতা মানুষের মধ্যে থাকা উচিত। সেটি মানুষ থেকে মানুষে স্থানান্তরিত হয়ে পরিণত চিন্তাশক্তির উত্স হিসেবে কাজ করতে পারে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সৃজনশীলতাকে অবহেলা করায় আগের মতো প্রতিভাধর মানুষ তেমনটি আর এখন দেখা যাচ্ছে না। এতে করে মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, মানবিক মূল্যবোধ, মানসিক উত্কর্ষসহ নানা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। আমরা যেভাবে মানুষের বিকশিত ও অগ্রসরমাণ সৃজনশীল ধারা দেখতে চেয়েছি তেমনটি দেখতে পাচ্ছি না। ঢালাওভাবে বিষয়টা সবার ক্ষেত্রে বলা ঠিক নয়। বরং আগে যেভাবে ও যে সংখ্যায় আমরা বহুমাত্রিক ধারণার প্রতিভাধর মানুষদের পেয়েছি তা ক্রমাগত সময়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ার পরিবর্তে কমেছে। কেন এমনটা ঘটছে? অনেকগুলো কারণ হয়তো এর পেছনে থাকতে পারে। সে কারণগুলো দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান কিংবা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যে কোনোভাবেই ঘটতে পারে। আমরা প্রতিনিয়ত মন দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যান্ত্রিকতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছি। এর ফলে আমাদের অবচেতন মন নিজের অগোচরে যান্ত্রিকতার আবর্তে পড়ে নিজেদের সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটাতে পারছে না। মানুষ নিজের মাথা খাটানোর পরিবর্তে খুব বেশি যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছে। এভাবে মানুষ ক্রমাগত মানব থেকে যন্ত্রদানবে পরিণত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, তবে কি আমরা প্রযুক্তিগত প্রগতির সুবিধা গ্রহণ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখব। অবশ্যই সেটি নয়। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন কিন্তু তা যেন সব ক্ষেত্রে না হয়। যন্ত্র মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে, মানুষ যাতে যন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। যন্ত্র মানুষের চিন্তাশক্তি থেকে সৃষ্টি, কিন্তু মানুষ যন্ত্র থেকে সৃষ্ট নয়। বিষয়টি আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা সাধারণ যোগ বিয়োগ করতেও ক্যালকুলেটর, মোবাইল আর কম্পিউটারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। যন্ত্র যা বলছে সেটিই মেনে নিচ্ছি, সেটাকে যাচাই করার চেষ্টা করছি না। এই সাধারণ যোগ বিয়োগ করার ক্ষেত্রে আমরা আমাদের মাথা ও মেধাকে কাজে লাগাচ্ছি না। এতে করে আমাদের মাথার কার্যকারিতা ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় চিন্তাশক্তিরও প্রকাশ ঘটছে না। চিন্তাশক্তি তৈরি না হওয়া আমাদের মধ্যে সৃজনশীল মনোভাবও গড়ে উঠছে না। কিন্তু খুব সহজে ছোটো একটি ধারণা থেকে আমাদের মধ্যে সৃজনশীল মনোভাব গড়ে উঠতে পারে। যেমন আমরা কাগজ দিয়ে উড়োজাহাজ বানাই। এমন কোনো মানুষ হয়তো আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা শৈশবে কাগজের উড়োজাহাজ বানাননি। একটা পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা এই উড়োজাহাজটি বানিয়েছি। নিছক খেলার ছলে কাগজের উড়োজাহাজটিকে বাতাসে উড়িয়েছি। প্রজাপতিকে উড়তে দেখেছি। পাখিকে উড়তে দেখেছি। সবগুলোই উড়ছে কিন্তু ওড়ার পদ্ধতি ভিন্ন। এই ভিন্নতা যদি আমাদের চিন্তাশক্তিকে আকৃষ্ট পারে, তাহলে সেখান থেকেই চিন্তার বহুমাত্রিকতার সূত্রপাত ঘটে। নতুন নতুন সৃষ্টিশীল ধারণা তৈরি হয়। পৃথিবীতে উদারবাদ, নিয়তিবাদ ও সামঞ্জস্যবাদের বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। নিয়তিবাদ বিশ্বাস করে সবকিছু পূর্বনির্ধারিত, নতুন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই, উদারাবাদ বিশ্বাস করে মানুষ সবকিছু স্বাধীনভাবে চিন্তা করে, এ চিন্তা আগে থেকেই নির্ধারিত নয়, সামঞ্জস্যবাদ এই দুইয়ের সম্মিলনের কথা বলে থাকে। যে মতবাদ যেটাই বলুক আমরা সবকিছুকে অতিক্রম করে নিজেদের সৃজনশীল হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এ ধারা স্থানান্তর করে সৃজনশীলতাকে সার্বিক নীতিমালায় নিয়ে আসা দরকার। তবেই মানুষের চিন্তাশক্তিতে দেশ এগিয়ে যাবে।

n লেখক :অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর