কেমন আছে আমাদের মেয়েরা

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২০, ২২:২৮

 

একজন শিক্ষিত নারী, স্বল্পশিক্ষিত অথবা নিরক্ষর নারীর তুলনায় বহুমাত্রায় জীবনের, পরিবারের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন শ্রমবাজারে বুঝেশুনে অংশগ্রহণ করতে পারে, বেশি উপার্জন করতে পারে, সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে এবং নিজের সন্তানদের জন্য ভালো স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে। শিক্ষার উপকার এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যখন একটি দেশের সামাজিক কাঠামো এবং অর্থনীতি প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তখন মেয়েদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি ও সমাপনের পথে তা বাধা সৃষ্টি করে। গত দুই দশক থেকে বৈশ্বিকভাবে শিক্ষার লক্ষ্য ও আইনে লিঙ্গ সমতার অসম অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। অতি সম্প্রতি ইউনেস্কোর ১৬১টি দেশের তথ্য থেকে জানা যায়, ৬০ শতাংশ দেশ প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা অর্জন করেছে, অন্যদিকে মাত্র ৩৮ শতাংশ মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে সমতা অর্জিত হয়েছে। মূলত জেন্ডার অসমতা দেখা যায় নিম্ন আয় সম্পন্ন দেশগুলোতে, এসব দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০ শতাংশ এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০ শতাংশ মেয়ে ভর্তি হয়। এটি একটি অনেক বড়ো চ্যালেঞ্জ। সারা পৃথিবীতে বহু মেয়ে এখনো শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সামাজিকভাবে আরোপিত নারী-পুরুষের দায়িত্ব ও কিছু মূল্যবোধের কারণে এখনো নিম্ন আয়ের দেশগুলোর বাবা-মা মনে করেন, অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হওয়াই ভালো, পড়ালেখার জন্য দেরি করে বিয়ে করার প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশের দিকে তাকালে একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে, মেয়েরা যত ওপরের শ্রেণিতে ওঠে—ঝরে পড়ার হারও তত বাড়ে। সাধারণত নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরা বেশি ঝরে পড়ে। এ অবস্থায় মেয়েদের জন্য গ্রহণযোগ্য যোগ্যতা অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে অনেক দূর যেতে হবে। মৌলিক শিক্ষা সমাপনী এখনো মেয়েদের জন্য অনেক বড়ো একটি চ্যালেঞ্জ।

কেন এই ঝরেপড়া বা উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার কেন কম? এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে যা কিছু দেখেছি তা বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসা মূল কারণ হলো: সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের দূরত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়ার পথে বখাটে ছেলেদের উত্পাতও ইভটিজিং, স্কুলের পথে মেয়েদের নির্যাতন, মা-বাবার অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে আন্তরিক যোগাযোগের অভাব, শিক্ষক-শিক্ষাথীর অসম অনুপাত, স্কুলের আনন্দহীন পরিবেশ।

স্কুল থেকে ঝরেপড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাচ্ছে, যা কি না ধুঁকে ধুঁকে জীবনের পথে বিলীন হওয়ার সামিল। এর ফলে মেয়েরা ক্ষমতায়িত হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। তারা তাদের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়। এই মেয়েগুলো ‘বউ’ বা ‘মা’ হওয়ার জন্য তো তৈরিই হয়নি বরং এই শিশুবয়সে মা হওয়ার মতো শ্রেষ্ঠ অনুভূতি অনুভব করার বদলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশু জন্মদানের মতো বিপজ্জনক এবং ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তাদের যেতে হয়। তারা শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় অথবা স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়। অথচ এই দেশের উন্নয়নে আমাদের ভবিষ্যত্ নারীদের কত কিছুই না দেওয়ার রয়েছে।

এখন প্রয়োজন সকল ঝরেপড়া কিশোরী মেয়েকে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা যেন তারা মৌলিক শিক্ষা শেষে অর্থনৈতিক কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হতে পারে। এর ফলে সে ক্ষমতায়িত হবার স্বপ্ন দেখতে পারবে, নিজের জীবনের মানে খুঁজে পাবে এবং দেশের উন্নয়নে একজন গর্বিত নাগরিক হয়ে উঠতে পারবে।

ঢাকা