সাভারে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রোগী নির্যাতনের অভিযোগ

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২০, ০০:০০

রাজধানীর পার্শ্ববর্তী সাভার উপশহরের বিভিন্ন এলাকায় বেশকিছু মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। তবে অধিকাংশ নিরাময় কেন্দ্রেরই যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই। এছাড়া নেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের তদারকির ব্যবস্থা। অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোতে মাদকাসক্তদের মোটামুটি সঠিক চিকিত্সা হলেও অবৈধ কেন্দ্রগুলোতে পাওয়া যায় তার উলটো চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ কেন্দ্রে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিত্সার জন্য আনা হলেও মূলতঃ তারা সেখানে মাদক সেবনেরই সুযোগ পান। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের লোকজনই তাদের কাছে মাদক সরবরাহের মাধ্যমে ব্যবসা করে থাকে। দেওয়া হয় না যথাযথ চিকিত্সা সেবা। অপরদিকে নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হওয়া কেউ যদি কেন্দ্রের লোকজনের কথামত না চলে তাহলে তাদেরকে ভয়ংকর নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সম্প্রতি এমন একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে জাহাঙ্গীর মিয়া নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় সাভার থানায় দায়ের করা হয়েছে হত্যা মামলা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চমকপ্রদ সাইনবোর্ডে আকৃষ্ট হয়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে তার পরিবারের লোকজন অনুমোদনবিহীন এসব নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করে থাকেন। সাভারের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অধিকাংশ মাদক নিরাময় কেন্দ্রে নেই মাদকাসক্তি নিরাময়ের তেমন কোনো চিকিত্সা ব্যবস্থা, নেই সুন্দর পরিবেশ, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, প্রশিক্ষিত নার্স কিংবা বয়। বিভিন্ন বাসা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বড়োবড়ো সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে চলছে এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম। এলাকার মাদক ব্যবসায়ী এবং কিছু চিহ্নিত বখাটেদের এসব নিরাময় কেন্দ্রে নিয়মিত যাতায়াত করতে দেখা যায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কোনো কোনো কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই মাদকাসক্ত এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ভর্তি হওয়া মাদকাসক্তদের চিকিত্সার পরিবর্তে উলটো টাকার বিনিময়ে গাঁজা, ইনজেকশন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহ করা হয়।

নিরাময় কেন্দ্র থেকে ফিরে আসা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন ভর্তি হওয়া রোগীরা নিরাময় কেন্দ্রের লোকদের কথা না শুনলে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। বেশিরভাগ সময় হাত পা বেঁধে মারধর করে মেঝেতে শুইয়ে রাখা হয়। এমনকি যেসব রোগীরা একদমই কথা শুনতে চায় না তাদেরকে হাত পা বেঁধে চিত্ করে মুখের মধ্যে কাপড় ঢুকিয়ে নাক দিয়ে গরম পানি ঢালা হয়। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সাভার পৌর এলাকার রেডিও কলোনি মহল্লায় অবস্থিত ‘নিউ আদর মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে’ এমনই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে জাহাঙ্গীর মিয়া নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেফতার করলেও নিরাময় কেন্দ্রের ৩ জন মালিক আরিফুল ইসলাম জুয়েল, আরিফুল ইসলাম রাজু ও রোমান মৃধা এখনো পলাতক রয়েছে। নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীরকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির পরদিন ঐ কেন্দ্রে ফোন করে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে দেখা করার জন্য অনুমতি চাওয়া হয়। তখন নিরাময় কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর সম্পূর্ণ সুস্থ আছে জানিয়ে এক মাস পর  পরিবারকে দেখা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তার আধা ঘণ্টা পরই নিরাময় কেন্দ্রের লোকজন জাহাঙ্গীরের পরিবারকে ফোন করে এনাম মেডিক্যালে কলেজ হাসপাতালে যেতে বলে। তাদের কথা মতো হাসপাতালে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা জাহাঙ্গীরকে মৃত অবস্থায় পান।

সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ এফ এম সায়েদ জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন যদি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে অভিযান চালায় তাহলে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তা করা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সায়েমুল হুদা বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক এসব নিরাময় কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের একটি ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। সাভারে একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন—এ বিষয়ে তিনি কোনো অভিযোগ পাননি। সাভার উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শিবলীজ্জামান বলেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনার জন্য মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদন লাগে। অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে কেউ এ প্রতিষ্ঠান চালু রাখলে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।