/ জামসেদুর রহমান সজীব
২০০৮ সালে ঠাট্টা যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি। ঠাট্টার সূচনালগ্ন থেকেই আমি এর নিয়মিত পাঠক ও লেখক। জাতীয় দৈনিক পত্রিকার একটি ফান সাপ্লিমেন্টে ক্লাস সিক্স পড়ুয়া এক আন্ডাবাচ্চা নিয়মিত লেখালেখি করে বিষয়টা ঠাট্টার মতো শোনালেও এটাই ছিল কড়া বাস্তবতা। যা নিয়ে আমার আনন্দের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা ছিল না। সেই সময়ে লেখালেখির প্রতি যে উত্সাহ উদ্দীপনা ছিল তা বাংলা ভাষা বা অন্য কোনো ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। এখনকার মতো ই-মেইলে লেখা পাঠানোর কোনো সুযোগ ছিল না তখন। লেখা পাঠাতে হতো ঐতিহাসিক ডাক বিভাগের মাধ্যমে। অনুর্বর মস্তিষ্কের উপর প্রেসার তৈরি করে সপ্তাহব্যাপী ধ্যান-তপস্যার পর এক একটি লেখা, কার্টুন তৈরি করতাম। তারপর তুমুল উত্তেজনা নিয়ে টকটকে হলুদ খামে ভরে সেটা পাঠিয়ে দিতাম ঠাট্টা দপ্তর বরাবর।
প্রথম পর্যায়ে ভীষণ দুশ্চিন্তা হতো ডাক মাধ্যমে যথাসময়ে লেখা পৌঁছাবে কি-না অথবা আদৌ পৌঁছাবে কি-না। দুশ্চিন্তার প্রভাব গিয়ে পড়ত হাতের নখ পর্যন্ত। কখনো বা পায়ের নখ পর্যন্ত গিয়েও পড়ত! চলত দীর্ঘ অপেক্ষা। কবে রবিবার আসবে, কবে নিজের নামখানা ছাপার অক্ষরে দেখতে পারব! তখন মনে হতো প্রতিমাসে রবিবার হয়ত একবারই আসে। আবার ক্যালেন্ডার ঘেঁটে আফসোস করতাম মাসে রবিবার কেন ১০/১২ বার আসে না! যাই হোক, রবিবার আসলে খুব ভোরে সাইকেল নিয়ে বাজারে চলে যেতাম। পত্রিকার গাড়ি আসার পূর্বেই পত্রিকা স্টলে উপস্থিত থাকা আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। তারপর যখন পত্রিকা হাতে পেতাম, অদ্ভুত এক শিহরণে শরীর ঠান্ডা হয়ে আসত। আর যখন ঠাট্টার পাতায় নিজের লেখা-নাম খুঁজে পেতাম, আনন্দে হার্ট অ্যাটাক হবার মতো অবস্থা হতো। আমি তো বারবার পড়তামই, আশপাশে যাদের পেতাম তাদের ঘেটি ধরে পড়াতাম লেখাটি। আর যদি না ছাপা হতো লেখা... থাক, কিছু না বলি!
দুই
সবকিছুরই একটা সময় থাকে। তখনকার দিনে আমাদের লেখালেখির সময়টা ছিল সেরা সময়। বলা যায় স্বর্ণযুগ। তার কারণগুলো বলি। তখন পাঠক-লেখক-প্রদায়ক-সম্পাদকের মধ্যে দারুণ রসায়ন ছিল। তারা একে-অপরের লেখা পড়ার পাশাপাশি লেখার কনটেন্ট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতেন, চলত সেরা লেখার প্রতিযোগিতা। পাঠকদের ভেতর আলাদা এক যোগাযোগ থাকত। কেউ কোনো সংখ্যা মিস করলে এক জেলার পাঠকবন্ধু অপর জেলার পাঠকবন্ধুকে ঠাট্টার সেই সংখ্যাটি পাঠিয়ে দিত। যে সবার আগে ঠাট্টা পেত সে বাকি লেখক বন্ধুদের কল দিয়ে জানিয়ে দিত তাদের লেখা ছাপা হয়েছে। সবচাইতে ভালো লাগার বিষয় ছিল যে পুরনো দিনে লেখকদের আলাদা কদরই ছিল। কেউ পত্রিকায় নিয়মিত লিখছে এটা জানলে সবাই বিষয়টাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করত। এটা সত্যি যে সেই সময়ে লেখকদের দারুণ কম্পিটিশন ছিল, তাই তাদের লেখার মানও হতো এখনকার চাইতে বহুগুণে ভালো। সময়ের সাথে সাথে কতকিছু পরিবর্তন হয়। বর্তমানে লেখক তো কমেছেই এমনকি কমেছে রম্য সাহিত্য চর্চা। দেশে এক সময় প্রায় প্রতিটা জাতীয় দৈনিকে আলাদা ফান সাপ্লিমেন্ট ছিল। সময়ের ব্যবধানে অনেকগুলো জাতীয় দৈনিকের ফান সাপ্লিমেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের কপাল ভালো যে ‘ঠাট্টা’ এখন পর্যন্ত তার পাঠকদের সাথে সিরিয়াসলি কোনো ঠাট্টা করেনি। প্রতি সপ্তাহে হালকার উপর ঝাপসা ঠাট্টা-বিনোদন দিয়ে যাচ্ছে সবাইকে।
তিন
দেখতে দেখতে ঠাট্টার এক যুগ পেরিয়ে গেলো। ভেবেই পাই না ক্যামনে কি! এর সাথে বিরোধী দলের কোনো গভীর চক্রান্ত তো থাকার সম্ভাবনা নাই। বহির্বিশ্বের কোনো কূটনৈতিক চাল থাকারও সুযোগ নাই। কোনো কারণ যদি থেকেই থাকে তাহলে সেটা পাঠক আর তাদের ভালোবাসা। এখন এই এক যুগ নিয়ে লিখতে গিয়ে দেখি ঠাট্টা নিয়ে অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আর সেগুলো থেকে বিশেষ এক স্মৃতির কথা না লিখলে পাপ হবে, পাপ! এই ঠাট্টা আমার লেখক জীবনের প্রথম ও সবচাইতে বড় স্বপ্ন পূরণ করেছে। কী সেই স্বপ্ন সেটা বলতে গেলে প্রথমে লেখালেখিতে আসার গল্প আগে বলতে হয়। শুরুতে আমার লেখক হবার কোনো ইচ্ছে ছিল না। আমি যখন খুব ছোট্ট ছিলাম, তখন আমি ম্যাগাজিন বলতে বুঝতাম কেবল যুগান্তরের বিচ্ছু। যা তখনো ঠিক মতন পড়তাম না। কেবল মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতাম মামুন হোসাইনের আঁকা প্রচ্ছদ কার্টুনের দিকে। আমার সবচাইতে প্রিয় কাস্টুনিস্ট, তার আঁকা কার্টুন দেখেই আমার কার্টুনের প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয়, শুরু হয় আঁকাআঁকি। যখন একটু আধটু বুঝতে শুরু করলাম, হঠাত্ করেই সংকল্প করে বসলাম একদিন আমি এমন ফান ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ কার্টুন আঁকব। এই স্বপ্ন নিয়ে ২০০৫ সালের শেষদিকে লেখালেখিতে হাত দিলাম। পাশাপাশি কার্টুনও আঁকতাম। শুরুর দিকে আমার আঁকা কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং পাত্তা না পেলেও লেখাগুলো ছাপা হতো নিয়মিতই। একটা সময় পর আমার আঁকা কার্টুনও ছাপা হতে থাকল।
এভাবে কেটে যায় বহু বছর। স্বপ্নও চাপা পড়ে যায় মনের গহীনে। কিন্তু ঠাট্টা হুট করে সেই স্বপ্নকে পূরণ করে দেয় এক সময়। যেই স্বপ্ন চোখে লেখালেখিতে আসা তা দীর্ঘ ৭ বছর পর ২০১২ সালের ২০ মে তারিখের ঠাট্টা তার পাঠক সংখ্যা মজারুতে পূরণ করে দেয়। আমার আঁকা কার্টুন দিয়ে সাজানো হলো ঠাট্টার পাঠক সংখ্যার প্রচ্ছদ। খুশির ঠ্যালায় আমি তখন পারলে আকাশে উড়ে বেড়াই। কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে সেটা করার সাহস পাইনি। এখন অবধি আমার জীবনের ছোট্ট প্রাপ্তির ঝুলি খুললে কৃতজ্ঞচিত্তে ঠাট্টার প্রচ্ছদ শিল্পী হবার আনন্দ অনুভব করি। যদিও ঠাট্টা সে সংখ্যায় কোথাও উল্লেখ করেনি প্রচ্ছদ কে এঁকেছে, তবুও আমি খুশি। ঠাট্টা তো এতটুকুন ঠাট্টা করার অধিকার রাখেই!
চার
ঠাট্টাকে নিয়ে যত লিখব তা কমই হবে। তবে গত এক যুগে ঠাট্টার চড়াই-উতড়াই, পরিবর্তন-পরিবর্ধন সবই দেখেছি। কখনো পাঠক হিসেবে, কখনো ঠাট্টা পরিবারের অংশ হিসেবে। এটা এক অদ্ভুত অনুভূতি। চোখের সামনে যেন ছোট্ট এক শিশুকে বড় হতে দেখা। সেই হিসাবে বলতে হয় ঠাট্টা এখন কৈশোরে পদার্পণ করেছে। আমি চাই ঠাট্টা এবার তরুণে পরিণত হোক, এক সময় বৃদ্ধও হোক, কিন্তু মৃত্যু যেন না হয়। অমর হয়ে থাকুক। আর এটা অসম্ভব কিছু নয়। ঠাট্টাকে কেবল তথাকথিত এক জাতীয় দৈনিকের ফান সাপ্লিমেন্ট হিসেবে যারা দেখেন তাদের জানাতে চাই, ঠাট্টা একটি প্লাটফর্ম। এর হাত ধরে সারাদেশে বহু লেখক-লেখিকা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি পাঠক পেয়েছে রম্য সাহিত্যের খোরাক। এক সময় ঠাট্টায় লিখেছেন এমন বহু লেখকদের বই প্রতিবছর বই মেলাতে প্রকাশিত হয়, যাদের লেখালেখির চর্চাই শুরু হয়েছিল ঠাট্টার বদৌলতে।
ঠাট্টাতে হাসি ঠাট্টা করেন কোনো সমস্যা নাই, কিন্তু ঠাট্টাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। ঠাট্টার গৌরবময় এক যুগের ইতিহাস দেখুন-জানুন, চমকে যাবেন। আগামীতে ঠাট্টাকে আরও বড় সাফল্যের চূড়ায় দেখতে চাই, এই প্রত্যাশায় অনাকাঙ্খিতভাবে বড় হয়ে যাওয়া এই লেখাটির এখানেই ইতি টানছি।
বি.দ্র. যারা এই লেখা পড়ে বিরস-বদনে ‘ধুরো, মজার কিছু পাইলাম না’ বলে হতাশ হয়েছেন তারা আবার লেখাটি পড়ুন এবং প্রতি তিন/চার লাইন পরপর নিজেকে বলুন —‘এইসব কী লিখছে, হে হে পাগল ছাগল’। দেখবেন কিছুটা হলেও মজা পাচ্ছেন!
