ঠাট্টা এবং আমি

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২০, ১৮:৪০

 

/ হেলাল নিরব

 

সেদিন আমার একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ‘ঠাট্টা’য়। আমি সকালে ঘুম থেকে উঠেই আগে ইত্তেফাকের ই-পেপার ঘেঁটে দেখলাম। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে শান্ত হয়ে ছোট্ট করে একটা ঘুম দিলাম। তবে দুঃখের বিষয় হলো সেই অসময়ের ঘুমটাই কাল হয়ে দাঁড়াল। ঘুমটা পরিণত হতে হতে বিকেল শেষ। ততক্ষণে খেয়াল করলাম চারপাশের আলো খানিকটা ক্ষীণ হয়ে আসছে। তড়িঘড়ি করে দুপুরের খাবারটা খেয়ে বন্ধু সাকিবকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমার লেখাগুলোর প্রাপ্য সম্মান একমাত্র এই ব্যক্তিটা দিয়ে থাকে। যা পাঠাই না কেন সেখানেই লাভ রিয়েক্ট। আর ফেসবুকের পোস্টে তার কমন দুটি কমেন্ট হলো, ‘দোস্ত সেরা’, ‘পুরা আগুন’। আর এর পাশে কয়েকটা ইমোজি। কখনো সেটা আগুনের, আবার কখনো হাতের পেশির।

যাহোক, একদিন আমার লেখার শুভকাঙ্ক্ষী বন্ধুকে এক বড় ভাইয়ের প্রকাশিত একটা গল্পের ছবি পাঠালাম। সে কাল বিলম্ব না করেই সেখানে রিপ্লাই দিল, ‘কেয়া বাত ভাই কেয়া বাত’।

আমি তার হিন্দির অর্থটা দাঁড় করালাম, সে গল্পটা পড়েইনি। তারপরও মেকি হলেও নিজের প্রশংসা শুনলে ভালোই লাগে। যা হোক, ঠাট্টা নিয়ে আমার ট্রাজেডিময় গল্পটা বলি।

তখন মাসের শুরু। অন্য ব্যাচেলরদের মাসের শেষে টাকা থাকে না, আর আমার ক্ষেত্রে তার পরিধি আরও বড়। মাসে বড় জোড় এক সপ্তাহ আমার কাছে টাকা থাকে। মাসের মাঝের দিকে। ঠাট্টায় লেখাটা এসেছিল সেই সোনায় সোহাগা সময়ের পরে। আমি রীতিমতো ফাঁকা। তবে লেখা তো সংগ্রহ করতেই হবে। বাধ্য হয়ে আমার লেখানুরাগী বন্ধু সাকিবকে নিয়ে পত্রিকা সংগ্রহ করতে বের হয়েছিলাম। সে আমার প্রডিউসার হিসেবে দারুণ কাজ করছিল।

দুঃখের বিষয় আমি যেখানে থাকি তার আশেপাশে কোনো পত্রিকার দোকান ছিল না। অগ্যতা হেঁটে হেঁটে মিরপুর-১০ নম্বরে এলাম। আকাশ থেকে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। চারপাশে বেশ অন্ধকার নেমে আসছে। পুরো এক ঘণ্টা ঘুরেও কোথাও পত্রিকা পেলাম না। আমি হতাশ। আমার এত সাধের লেখাটার একটা কপি সংগ্রহ করতে পারব না ভেবে যখন ভেঙ্গে পড়েছি, তখন আমার বন্ধু হাত বাড়াল ত্রাতা হয়ে। আমাকে আশস্ত করল—সে যেভাবেই হোক আমাকে পত্রিকা কিনে দিবে।

আমিও আমার ভক্তের কথায় আশস্ত হলাম।

আমরা ১০ নম্বর থেকে একটা মিনি বাসে চড়লাম। দশ টাকা ভাড়া দিয়ে দুজনে মিরপুর-১ নম্বরে নামলাম। কয়েকটা জায়গা ঘুরে অবশেষে পেলাম আমার কাঙ্খিত পত্রিকার দোকান। আচমকা বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে দোকানি নিজের দোকান বন্ধ করতে যাবে ঠিক তখনি আমরা তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দশ টাকার একটা লাল নোট এগিয়ে দিয়ে দোকানিকে বললাম, ‘একটা ঠাট্টা দেন’। দোকানি আমার বেড়ালের মতো চুপসে যাওয়া চেহারায় তাকিয়ে প্রথমে ঠাট্টাচ্ছলে হাসল। পরে সুর চড়িয়ে চোখ লাল করে বলল, ‘নাই’!

আমি হতাশ হওয়ার আগেই সাকিব দশ টাকা কেড়ে নিল। একটা ইত্তেফাক কিনে আমার লেখাটা বের করে দেখাল। হালে পানি পেলাম। আমার দুর্্বলতার সুযোগটা ঠিকই নিল আমার ভক্ত বন্ধু। দুই গ্লাস শরবত আর বিশ টাকার চটপটি খেয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম। নরম ছিটে গা এলিয়ে দিয়ে ভাবতে লাগলাম—বন্ধু আসলে ভয়ঙ্কর না, বন্ধুু মানে সাহায্য আর পাশে থাকার নাম।

ঠাট্টাময় দিনের ঘটনাটা এখানেই থামল না। রাতে আমাকে বন্ধু একটা সাদা কাগজে ফর্দ ধরিয়ে দিয়ে বলল—সেটা নাকি আমার বিল। আমি আকাশ থেকে পড়লাম না, মেসের ছাদ ফুঁড়ে আকাশে উঠে গেলাম—বুঝতে পারছিলাম না। বিলের কাগজে বন্ধু বিল লিখেছে ৭০ টাকা। আমি হিসেব করে দেখলাম, দশ টাকার একটা ‘ঠাট্টা’ কিনতে আমার খরচ হয়েছে ৬০ টাকা। সংগ্রহ বলে কথা!