দূষিত বায়ুর দেশ

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২০, ২১:৩৮

রাজিবুল হাসান সৈকত

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ারের প্রতিবেদন থেকে জানলাম গতবারের মতো এবারও বাংলাদেশ সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ। বায়ুদূষণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির দেশটিও বাংলাদেশ। যারা বায়ুমানের খোঁজ রাখেন তারা জেনে থাকবেন এবারের শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বায়ু প্রায় ধারাবাহিকভাবে ও দিনের বেশ লম্বা সময় যাবত্ বিভিন্ন শ্রেণিতে অস্বাস্থ্যকর ছিল, (স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্বেগের একিউআই স্তর অনুযায়ী) যা এখনো চলমান। একইসঙ্গে দেশের অধিকাংশ জেলার বায়ুতেও স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল। আজ রাত একটার তথ্য হচ্ছে : ঢাকার বায়ুর একিউআই ১৬৪ (এয়ার ভিজ্যুয়াল ওয়েবসাইট অনুসারে) যার অর্থ ‘অস্বাস্থ্যকর’। একিউআই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ রক্ষা সংস্থা (ইপিএ) কর্তৃক গণনাকৃত ও প্রকাশিত দৈনন্দিন বায়ুর মানের সূচক যা আপনাকে জানাবে আপনার বায়ু কতটা পরিচ্ছন্ন অথবা দূষিত এবং আপনার স্বাস্থ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র, ক্যাপসের একটি পর্যবেক্ষণ বলছে- ২০১৮র তুলনায় ২০১৯ সালে এ দেশে বায়ুদূষণ বেড়েছে ২০ শতাংশ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনও ইঙ্গিত দিচ্ছে—এ দেশে  প্রতি বছর বায়ুদূষণ বাড়ছে এবং ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।

বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে যা দেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। ফলে দেশের উন্নয়ন কার্যকরও টেকসই হচ্ছে না। পরিবেশবাদী আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্রিনপিসের প্রতিবেদনে সম্প্রতি এই তথ্য উঠে এসেছে। মানবদেহে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ, হার্টের অসুখ, ফুসফুসের ক্যানসার, নিউমোনিয়াসহ আরো অনেক জটিল রোগের জন্যও দায়ী এই ভয়াবহ বায়ুদূষণ। সম্প্রতি কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চ জার্নালের গবেষণা প্রতিবেদন দিয়েছে ভয়ংকর এক তথ্য—বায়ুদূষণে মানুষের আয়ু গড়ে প্রায় তিন বছর কমছে। একই কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৮৮.৮ লাখ মানুষ এবং বাংলাদেশে ১ লাখেরও বেশি মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে।

শিশুরা বায়ুদূষণের প্রধান শিকার। UNICEF Mongolia নামের ইউটিউব চ্যানেলের একটি ভিডিও এবং একটি ওয়েবসাইট মারফত জানতে পারলাম বায়ু দূষণকারী অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫ (পার্টিকুলেট ম্যাটার) মানবদেহে বিশেষত শিশুদের স্বাস্থ্যে কীভাবে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস) দহনে সৃষ্ট পিএম ২.৫ আকৃতিতে ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম। ফলে খুব সহজেই শিশুর অপরিণত ফুসফুসের অ্যালভিওলাই (ফুসফুসের সবচেয়ে গভীর অংশ এবং এখানে গ্যাস বিনিময় হয়) এর পাতলা প্রাচীর পেরিয়ে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। এটি দেহের সকল অঙ্গে স্থানান্তরিত হয়। যার ফলে শিশুর ইমিউন সিস্টেম, ফুসফুস, হূিপণ্ড আক্রান্ত হয়। পিএম ২.৫ ব্রেইন সেলগুলোর ক্ষতি করে। ফলে শিশুর বর্ধনশীল মস্তিষ্কও এতে আক্রান্ত হয়। ফলশ্রুতিতে শিশুর বুদ্ধির বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

জীবাশ্ম জ্বালানি দহনে অর্ধেক বায়ুদূষণ হয়ে থাকে। এই জ্বালানি দহনে নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড, পিএম ১০ এবং অসম্পূর্ণ দহনে কার্বন মনো-অক্সাইড উত্পন্ন হয়। তাই জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা সরকারের কাছে দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করি—যে কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হাতে নেওয়ার সময় পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি যেন অগ্রাধিকার পায়। দখলদূষণে হারিয়ে যাওয়া জলাশয়, নদী রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশিত। এক্ষেত্রে সরকারের নদী রক্ষা মহাপরিকল্পনাকে স্বাগত জানাই এবং এর সাফল্য কামনা করছি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ-শিল্পায়নের ফলে আর কোনো জলাশয় ভরাট কিংবা বৃক্ষনিধনের মতো কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হোক এবং সেইসঙ্গে ঢাকাসহ পুরো বাংলাদেশে সবুজায়নে উদ্যোগী হতে হবে। বায়ুদূষণের সময় প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আরো জোরালো ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে— জনগণকে প্রতিদিন অথবা প্রতিঘণ্টায় বায়ুর একিউআই মানের আপডেট দেওয়া এবং এক্ষেত্রে তাদের কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে অথবা আদৌ রয়েছে কি না এবং তদনুযায়ী কী স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা  গ্রহণ করতে  হবে সে বিষয়ে অবহিত করে বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমনে ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে জনসচেতনতার বিকল্প নেই।

n লেখক :শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়