অবশেষে দেশের সমুদ্রভাগে তেল-গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধানে নামছে সরকার। সাগরে খনিজ সম্পদ প্রাপ্তির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে নরওয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি করেছে রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। দেশের প্রায় অর্ধ শতকের ইতিহাসে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এমন চুক্তি করল। এর মাধ্যমে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরজা খুলল।
দেশের স্থলভাগে গ্যাসের প্রমাণিত মজুদ শেষ হয়ে আসছে। আর সমুদ্রভাগে তেল-গ্যাসের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ও বিদেশি বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন। ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে (ইকসিড) ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার নিষ্কণ্টক সমুদ্র এলাকার মালিক হয় বাংলাদেশ। এরপর ভারত ও মিয়ানমার তাদের অঞ্চলে গ্যাসের সম্ভাব্যতা যাচাই, অনুসন্ধানশেষে বাণিজ্যিক উত্পাদনও করছে। মিয়ানমার বিদেশেও গ্যাস রপ্তানি করছে। আর বাংলাদেশ সেই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজই শুরু করতে পারেনি। এমনকি ২০১৫ সালে একটি বিদেশি কোম্পানিকে এ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেও পিছিয়ে আসে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এমন প্রেক্ষাপটে মাল্টি-ক্লায়েন্ট সিসমিক সার্ভে করার লক্ষ্যে নরওয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি টিজিএস-নোপেক এবং শ্লম্বার্জারের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে পেট্রোবাংলা। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে টিজিএস-নোপেক এবং শ্লম্বার্জারের কর্মকর্তারা বাংলাদেশে আসেননি। তাদের স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র গতকাল বুধবার পেট্রোবাংলায় এসেছে। এ চুক্তির আওতায় বহুজাতিক কনসোর্টিয়ামটি বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে দ্বিমাত্রিক ভূকম্প জরিপ পরিচালনা করবে। বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর ২৬টি ব্লকে তারা জরিপ শেষ করবে দুই বছরে। জরিপের তথ্য বাংলাদেশ সরকারসহ আগ্রহীদের কাছে বিক্রি করতে পারবে টিজিএস-নোপেক এবং শ্লম্বার্জার। জরিপে প্রাপ্ত তথ্য ইতিবাচক পাওয়া গেলে তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করবে সরকার।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলেছিল। কয়েক বছর ধরে এতে গতি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গত বছর উত্পাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির (পিএসসি) কিছু শর্ত বহুজাতিক কোম্পানিবান্ধব এবং তাদের জন্য আরো মুনাফা তৈরির সুযোগ করে দেওয়া হয়। এর ফলে জরিপের ফলাফল ইতিবাচক হলে সরকার দ্রুত সময়ে গ্যাস উত্পাদনে যেতে পারবে।
মডেল পিএসসি ২০১৯ অনুযায়ী, প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো ৭ দশমিক ২৫ মার্কিন ডলার পাবে। আগের পিএসসিতে এটি ছিল ৬ দশমিক ৫ ডলার। নতুন মডেল পিএসসিতে কূপ খননের বাধ্যবাধকতা নেই। গ্যাস পরিবহনের জন্য ১ শতাংশ ট্যারিফ তুলে নেওয়া হয়েছে। নতুন পিএসসি অনুযায়ী রপ্তানির আগে বহুজাতিক তেল কোম্পানি পেট্রোবাংলাকে গ্যাস কেনার প্রস্তাব দেবে। পেট্রোবাংলা গ্যাস না কিনলে তা দেশের ভেতরে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির চেষ্টা করবে। তাতেও ব্যর্থ হলে বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে। বহুজাতিক কোম্পানি সমুদ্রভাগে যে গ্যাস পাবে তাতে তার ও পেট্রোবাংলার অংশ—দুটিই রপ্তানি করতে পারবে। অগভীর সমুদ্রে উত্পাদিত গ্যাসের সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পাবে বহুজাতিক কোম্পানি। বঙ্গোপসাগরের ২৬টি গ্যাস ব্লকের মধ্যে গভীর সমুদ্র ব্লক ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্র ব্লক ১১টি।
উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে দৈনিক ৪২০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদার বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্পাদিত হয়। প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে পেট্রোবাংলা এবং বেসরকারি কোম্পানি সামিট। অর্থাত্ দেশে এখন অন্তত ৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে সংকটও বাড়ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সমুদ্রভাগের গ্যাস উত্তোলনের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
