তাহমিদ আহমেদ শুভ্র
মেহেরপুরের ছোট্ট শহর বৈদ্যনাথ তলা। আরেকটি নাম আছে, আম্রকানন। মূলত আমগাছে ঢাকা বলেই এ নাম। মুগ্ধকর আম বাগানটির মালিক ছিলেন কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের ভবের পাড়ার জমিদার বৈদ্যনাথ বাবু। বৈদ্যনাথ বাবুর নামানুসারেই দিনদিন জায়গাটির নাম হয়ে ওঠে বৈদ্যনাথ তলা। সেখানেই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা, পাঠ করা হয় বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। শপথ গ্রহণ এবং ঘোষণাপত্র পাঠের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ একটি বিবৃতি পাঠ করেন এবং বৈদ্যনাথ তলার নাম রাখেন মুজিবনগর।
সেই থেকে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার নাম হয় মুজিবনগর। সেদিন মুজিবনগরকে অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশের রাজধানী ঘোষণা করা হয়। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু জায়গাটি সঠিকভাবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনার পর মুজিবনগর সরকারকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৯৭৪ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসের দিন মুজিবনগর স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মুজিবনগরকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাধীনতার স্মৃতি ধরে রাখতে ২৩ স্তরের স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন হয় তারই হাতে।
তবে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। এখানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতি মানচিত্র ও জাদুঘর তৈরি করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পুরো চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দেখানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও নারী নির্যাতনের চিত্র। নির্মিত মানচিত্রের চতুর্দিক ঘিরে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনা ও ধ্বংসলীলা বিভিন্ন চিত্র ম্যুরাল-ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
মানচিত্র জাদুঘরে যা আছে
দেখার মতো
মুজিবনগরে নির্মিত সবুজ চত্বরে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলাদেশের স্মৃতি মানচিত্র। মানচিত্রের বুকে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে দেখানো হয়েছে। তার মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশের বেনাপোল, বনগাঁও, বিরল, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে শরণার্থী গমন। এছাড়া হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ধ্বংস, আ স ম আব্দুর রবের পতাকা উত্তোলন, শাহজাহান সিরাজের ইশতেহার পাঠ, শালদাহ নদীতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ, কাদেরীয়া বাহিনীর জাহাজ দখল ও যুদ্ধ, পাকবাহিনীর সঙ্গে কামালপুর, কুষ্টিয়া ও মীরপুরের সম্মুখ যুদ্ধ।
শুভপুর ব্রিজের দু-পাড়ের মুখোমুখি যুদ্ধসহ চালনা ও চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংসের নানা চিত্র দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া পাহাড়তলী ও রাজশাহীতে পাকবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, জাতীয় শহীদ মিনার ধ্বংস, জাতীয় প্রেসক্লাবে হামলা, সচিবালয়ে আক্রমণ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও জগন্নাথ হলের ধ্বংসযজ্ঞ, তত্কালীন ইপিআর পিলখানায় আক্রমণ, রায়ের বাজার বধ্যভূমি এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার চিত্র তো রয়েছেই।
মানচিত্রের চারদিকে স্বাধীনতাযুদ্ধে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের সাহসী নেতৃত্ব ও ভূমিকার ছবিসহ ৪০টি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মধ্যে তত্কালীন সেনাপ্রধান, উপ-প্রধান, বীর উত্তম, জাতীয় চার নেতা, তারামন বিবি, সেতারা বেগমের মূর্তমান ছবিসহ ব্রোঞ্জের তৈরি ২৯টি অবক্ষ ভাস্কর্য ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ৩০ নেতার তৈলচিত্র রয়েছে। সেখানে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর বর্বরতা, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী অবদান ও জীবন বাজি এবং মুক্তিযুদ্ধে তত্কালীন নেতাদের দেশপ্রেম।
বহিরাংশ সাজানো হয়েছে যেভাবে
মানচিত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে চলে যান মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের সামনের অংশে। এখানে যেন বঙ্গবন্ধু হাত উঁচিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। তখনই যেন তার ভরাট কণ্ঠে ভেসে এলো, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম...। এছাড়া ২৫ মার্চের কালরাত্রির হত্যাযজ্ঞ, পাকবাহিনীর হাতে নারী নির্যাতন ও সম্ভ্রমহানী, মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল এ মুজিব নগরে দেশের প্রথম সরকারের শপথ ও সালাম গ্রহণ, মেহেরপুরের স্থানীয় ১২ আনসার সদস্য মুজিবনগর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দকে গার্ড অব অনার প্রদান, সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের গোপন বৈঠক, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডারদের সেক্টর বণ্টন সভা ছাড়াও অরোরা, নিয়াজী ও এ কে খন্দকারের উপস্থিতিতে পাকবাহিনীর আত্মসর্মপণের চিত্র নির্মিত ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এক সময় মুজিবনগরে বিশাল একটি আমবাগান ছাড়া দেখার তেমন কিছুই ছিল না। এখন মুজিবনগর সেজেছে দেশের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় মূর্তমান প্রতীক হয়ে। শত কোটি টাকা ব্যয়ে এখানে নানা অবকাঠামো উন্নয়নসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতি মানচিত্র ও জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও এখানে কিছু বহুতল আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যেমন পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পর্যটন মোটেল ও শপিংমল, সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে শিশুপল্লী, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে মসজিদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পোস্ট অফিস ও টেলিফোন অফিস, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও হেলিপ্যাড এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ৬ দফা ভিত্তিক গোলাপ বাগান নির্মাণ করা হয়েছে।
