নুরুল করিম
‘কম রেজুলেশনের একটি ছবি নির্বাচন করা হলো। কোনো এক সংবাদ সম্মেলনের ছবিই হবে। মাইক্রোফোনটা নিচু করে একপাশে তাকিয়ে কারও সঙ্গে চোখাচোখি করে হাসছিলেন বঙ্গবন্ধু। হাসিটা বেশ স্বতঃস্ফূর্ত। ছবিটা যে কারও নজরকাড়ার মতো, কিন্তু খুব কম মানুষই দেখেছেন। আগেই বলেছি, এটির রেজুলেশন কম, তাই ধরে ধরে কাজ করতে হয়েছে।’—আড্ডার শুরুতেই এভাবে বললেন সাব্যসাচী হাজরা। প্রসঙ্গ ছিল মুজিবর্ষের লোগো।
যারা বইপ্রেমী বা বই পড়েন কিংবা প্রচ্ছদশিল্পের খোঁজখবর রাখেন তাদের কাছে সাব্যসাচী হাজরা নামটা বেশ পরিচিত। এই সময়ে বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়দের একজন প্রচ্ছদশিল্পী সব্যসাচী হাজরা। তিনি সবসময় পড়তে ভালোবাসেন। সেই চিন্তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে পেইন্টিংয়ে মাস্টার্স করার পর সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন বইয়েই। তার করা প্রচ্ছদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে এক পৃষ্ঠায় পুরো বইয়ের সারমর্ম উঠে আসে। তার করা মুজিববর্ষের লোগোতে বঙ্গবন্ধুর হাসিমুখটাই সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত করেছেন।
মার্চ এলেই প্রতিটি বাঙালির হূদয়ে সর্বাগ্রে যে নামটি উচ্চারিত হয় এবং মনের পাটাতনে আলোড়ন সৃষ্টি করে তিনিই শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, যার বদৌলতে আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। একাত্তর থেকে এ পর্যন্ত যত মার্চ আমরা পেরিয়ে এসেছি তার থেকে ২০২০ সালের মার্চ আমাদের সামনে এক অভিন্ন মাত্রায় আজ উপস্থিত। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ পূর্ণ হবে আগামীকাল। তাই আগামীকাল থেকে শুরু হয়ে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত, এই ১২ মাস জাতীয়ভাবে মুজিববর্ষ উদযাপন করা হবে। এই ঐতিহাসিক উদযাপনকে কেন্দ্র করে যে লোগো ব্যবহার হচ্ছে সেটির শিল্পীর কাছেই শোনা হলো নেপথ্যের গল্প।
লোগো নির্বাচনের শুরুতেই একটা প্রশ্ন সামনে এলো, বঙ্গবন্ধুর কোন ছবিটি লোগোর ক্ষেত্রে ব্যবহার হবে? এই সিদ্ধান্ত আর লোগোর ছবিটি নির্বাচনে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। বঙ্গবন্ধুর সেই তর্জনী, প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে গুরুগম্ভীর ভরাট গলায় ভাষণ দেওয়ার মুহূর্ত এবং হাস্যরত স্নেহময় মুখের মধ্যে হাস্যজ্জ্বল ছবিটিই বাছাই করলেন প্রধানমন্ত্রী। বাকি কাজটা করলেন শিল্পী সাব্যসাচী হাজরা। উদযাপন কমিটি থেকে বলা হয়েছিল, লোগোটা বড় আকারে বিমান ব্র্যান্ডিং থেকে শুরু করে ছোট কোনোকিছুতেও ব্যবহার করা হবে। তাই এমন একটা কম্পোজিশনই তাকে তৈরি করতে হয়েছে যেটার মান সব জায়গাতেই অটুট থাকে।
সব্যসাচী হাজরা বলেন, ‘কয়েকজন শ্রদ্ধাভাজন শিল্পী ও সংশ্লিষ্ট অনেকের পরামর্শ নিয়েছি লোগোটার ক্ষেত্রে। অনুজপ্রতিম শিল্পী আরাফাত খুব যত্ন করে রেখার আঁচড়ে হাসিটি ফুটিয়ে তুলেছেন। ফ্রন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৬০/৭০ দশকের সংবাদপত্রে ব্যবহূত শিরোনামের ব্লকের যে ধরন সেখান থেকে ফ্রন্ট তৈরি করা হয়েছে। অক্ষর বিন্যাসে ৬০-৭০-এর দশকে সংবাদপত্রে ব্যবহূত অক্ষর, লাল-কালোতে। লালটা আন্দোলন-সংগ্রামের চিহ্ন বহন করে। সোনালি রঙ দিয়ে হানড্রেড লেখা হয়েছে উদযাপনের আমেজ আনতে।’
জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের লোগো, বোঝাই তো যায় এটা কতটা চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিল। শিল্পীর মতে, এটি কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা উত্সবের লোগো নয়, ১৬ কোটি মানুষের আবেগ রয়েছে এতে। খুব মায়া নিয়ে কাজটা করতে হয়েছে। সব্যসাচী হাজরা বলেন, ‘এটা আমার জীবনের দুর্লভ সুযোগ, সেরা অভিজ্ঞতা ও অন্যতম কঠিন কাজ ছিল।’
সব্যসাচী হাজরা
