চা বাগানের হোলি

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২০, ১৮:৪০

অনুজকান্তি দাশ

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

 

আবহমানকাল ধরে চা শ্রমিকের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে রঙিন হয়ে মিশে আছে রঙের খেলা হোলি। ‘রাঙা হোলিয়ামে পিয়াওয়া বলাউলে নেহি যায়, বলাউলে নেহি যায়, রাঙা হোলিয়ামে। তহারাসে ছোটি ছোটি ভইলে লরো করিয়াহো, ভইলে লরো করিয়া হো, ভইলে লরো করিয়া।’—চা বাগানের আঞ্চলিক ভাষায় গাওয়া মিষ্টি-মধুর আবহে এই গানটি ধরেই ফাগুয়ার হোলি উত্সবে মেতে ওঠেন চা শ্রমিকরা। হোলি উত্সবকে ঘিরে প্রতিবছর ব্যাপক উত্সাহ উদ্দীপনা আর আনন্দ উল্লাসে গায়ে রঙ মেখে নেচে-গেয়ে সারা পাড়া ঘুরে বেড়ান তারা। চা শ্রমিকদের মনে তখন ভর করে রঙধনুর সাত রঙ। প্রাণের উচ্ছ্বাসে সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে তখন সব বয়সীরা একত্রে মেতে ওঠে রঙের উত্সবে। মনের আনন্দে একে অন্যের দিকে ছুঁড়ে মারে আবির রঙ। ‘উঠো ভারতো রামও মিলন আয়ে হয়ে মিলন আয়ে, মিলন আয়ে, উঠো ভারত রামও মিলন আয়ে’—এই আহ্বান সংগীতের মধ্য দিয়ে চা বাগানের নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীসহ সকলেই একে অপরকে হোলি খেলায় আমন্ত্রণ জানান। হোলি উপলক্ষে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সাজসজ্জায় সজ্জিত হয়ে দলবেঁধে বাগানের প্রতিটি লেবার লাইনে ঘুরে ঘুরে সকল শ্রমিক ঘরের অঙিনায় অষ্টসখীসহকারে রাধা-কৃষ্ণের গোপাল নাচ পরিবেশন করা হয়। মৃদঙ্গের বাদ্য আর কাঠি নৃত্যের তালে এ সময় কুকিল কণ্ঠে একসঙ্গে গেয়ে ওঠেন চা শ্রমিকরা। তখন চা শ্রমিকরে ভাষায় গাওয়া ‘কুহাকি কুহাকি বলেরে কৈলর, বইসেলা আম্বাকে ডাল, কাহারে কৈলরও তর জাতির পিতা, কাহারে তর বাসা’ গানটির শ্রুতিময় সুর ভেসে বেড়ায় বসন্ত বাতাসে।

সারাবছর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর ফাগুয়ার হোলি উত্সবে যেন রঙে রঙিন হয়ে ওঠে চা শ্রমিকের হূদয়-মন। ছন্দ, তাল ও লয়হীন চা শ্রমিকদের জীবনে হোলি উত্সব যেন এনে দেয় মহানন্দের জোয়ার। বসন্ত ঋতুতে ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথীতে অনুষ্ঠিত এই হোলি উত্সবের রঙিন ছটায় চা বাগানের মেটোপথগুলো রঙিন হয়ে ওঠে এদিন।

হোলি উত্সব একদিনের হলেও চা বাগানগুলোতে এই উত্সবের জন্য ৩ দিনের ছুটি হয়ে থাকে। উত্সব আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে চা শ্রমিকরা অতীতের দুঃখভারাক্রান্ত মুহূর্তগুলোকে ভুলে গিয়ে এ আনন্দের রেশ টেনে নেয় পুরো মাস। মাসব্যাপী প্রতিটি শ্রমিক বস্তিতেই দিনরাত জমে ওঠে হোলি ও ঝুমুর গানের জমজমাট আসরে। সেইসঙ্গে রাধা-কৃষ্ণ ও সখীদের সাজে সজ্জিত ঐতিহ্যবাহী কাঠি নাচের প্রদর্শনী তো আছেই।

এ সময় মৃদঙ্গের তালের বাহারি সাজে সজ্জিত নারী-পুরুষরা পাহাড়ি গানের সুরে সুরে চা শ্রমিকদের কাঠি নৃত্যগীত প্রকৃতিতে সৃষ্টি করে এক অন্যরকম আবহ। হোলি উপলক্ষে কোনো কোনো চা বাগানের বাজারগুলোতে দোকানিরা মণ্ডা মিঠাইয়ের পসরা সাজিয়ে বসে। অবশেষে মাসব্যাপী আনন্দ ভোগের পর তারা আবার ফিরে যায় তাদের সেই চিরাচরিত নিয়মের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে।

এ বছর মুজিব শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের ফুলছড়া চা বাগানে গত ১৩ মার্চ চা জনগোষ্ঠীর বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপিত হয়েছে ফাগুয়া উত্সব। এছাড়াও উপজেলার ভাড়াউড়া, ভুড়ভূড়িয়া, কাকিয়াছড়া, কালীঘাট, রাজঘাট, সাতগাঁওসহ অন্যান্য চা বাগানে শ্রমিকরা হোলির আনন্দ উপভোগ করেন নিজেদের মতো করে।

হোলির কয়েকদিনে চা বাগান এলাকাগুলো ঘুরে দেখা যায় এর বাহারি চেহারা। হোলির আনন্দ আর উত্সবে যেন একই রঙে রঙিন হয়ে ওঠে  সব মানুষের মুখ। চারদিকে রঙের ছড়াছড়ি। ছোপ ছোপ রঙের দাগ লেগে আছে চা বাগানের অলিগলি, শ্রমিক লাইন ও বাড়িঘরের আঙিনায়। লাল, নীল, বেগুনি, সবুজ, হলুদ, গোলাপিসহ নানা বর্ণে বর্ণিল মুখ নিয়ে পথে পথে সমবেত হয়ে বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে আবির খেলা আর রঙ মাখামাখিতে ব্যস্থ সময় কাটাচ্ছেন চা শ্রমিকরা। রঙের ছটায় নানা রঙের পোশাকগুলোও তাদের হয়ে উঠেছে আরো রঙিন। হোলির আনন্দে রঙিন মুখ নিয়ে সকলেই যেন উচ্ছ্বসিত।

সনাতন ধর্মানুসারে দ্বাপর যুগে এই দিনে মথুরার বৃন্দাবনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাধার সঙ্গে এভাবে হোলি খেলেছিলেন। শাশ্বত সেই প্রেমকাহিনি বাঙালি-অবাঙালির হূদয়ে আজও লালিত। প্রেম শুধুই ভালোবাসা, প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই নয়, বরং মানুষে-মানুষে, মানুষে-প্রকৃতিতে কিংবা মানুষের সঙ্গে প্রাণি জগতের প্রেমই এখানে প্রধান হিসেবে বিবেচ্য হয়ে আসছে শতশত বছর ধরে। আর সেই চিরন্তনী মেনেই পালিত হয়ে আসছে হোলি উত্সব।

তবে হোলির বিশদ ব্যাখা বর্ণনায় জানা যায়, রাক্ষ্মসী হোহিকাদহনের মধ্য দিয়ে হোলি উত্সবের আবির্ভাব ঘটে। স্কন্দপুরাণ গ্রন্থের ফাল্গুনমাহাত্ম্য গ্রন্থাংশে হোলিকা ও প্রহল্লাদের উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। হোলিকা ছিলেন মহর্ষি কশ্যপ ও তার পত্নী দিতির পুত্র হিরণ্যকশিপুর ভগিনী। ব্রহ্মার বরে হিরণ্যকশিপু দেব ও মানব বিজয়ী হয়ে দেবতাদের অবজ্ঞা করতে শুরু করেন। কিন্তু তার পুত্র প্রহল্লাদ ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। প্রহল্লাদ বিষ্ণুকে নিজ পিতার ওপরে স্থান দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে হিরণ্যকশিপু নিজের পুত্রকে পুড়িয়ে মারার আদেশ দেন। দাদার আজ্ঞায় হোলিকা প্রহল্লাদকে কোলে নিয়ে অগ্নিতে প্রবেশ করেন। কিন্তু বিষ্ণুর কৃপায় প্রহল্লাদ অক্ষত থাকেন, বরং আগুনে পুড়ে হোলিকারই মৃত্যু হয়। হোলিকার এই অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কাহিনিই দোলের পূর্ব দিনে অনুষ্ঠিত হোলিকাদহন, চাঁচর কিংবা প্রচলিত ভাষায় সম্মত্ উত্সবের সঙ্গে যুক্ত। তাই হোলি উত্সবের আগের দিন হোলিকা দহন হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, লতাপাতা, খড়কুটা, গুল্মকাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সুউচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে রাক্ষ্মসী হোলিকার দহন করা হয়। পরের দিন থেকে আবির রঙ খেলার মধ্য দিয়ে হোলি উত্সবের আনন্দে মেতে ওঠেন সকলে।

রাক্ষ্মসী হোলিকাদহনের মাধ্যমে ধার্মিকের বিজয় আর অধার্মিকের পরাজয়ের ঘটনা থেকে প্রতিবছর যে বিজয় উত্সব পালিত হয়ে আসছে তাই হোলি উত্সব নামে খ্যাত হলেও সনাতন ধর্মাবলম্বীর অন্যান্যরা দোল পূর্ণিমা হিসেবেই হোলি উত্সব পালন করে থাকে।

অপর এক বিশ্লেষণে জানা যায়, হোলি শব্দের উত্পত্তি হয়েছে হোলা থেকে, যার অর্থ হলো আগাম ফসলের প্রত্যাশায় ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন। সংস্কৃত শব্দ হোলকা, অর্থাত্ অর্ধপক্ক শষ্য থেকেও হোলি শব্দটির উত্পত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এখনও অনেক অঞ্চলে হোলির দিনে অর্ধপক্ক গম এবং ছোলা খাওয়ার রীতি আছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞজনরা।

এদিকে বাংলা সংস্কৃতিতে হোলি উত্সবকে বসন্ত উত্সবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে। যদিও তার ব্যাপকতা কম। জানা যায়, বাংলা ঋতুচক্রের শেষ উত্সব দোল পূর্ণিমা, অর্থাত্ হোলি উত্সব। বসন্তের পাতাঝরা সময়ে বৈশাখের প্রতীক্ষায় এই দিনে পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাত্পর্য দেখা দেয়। পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন হোকািদহন, চাঁচর কিংবা সম্মত উত্সব উদযাপনকেও এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ইদানিংকালে চা বাগানগুলোতেও কেউ কেউ হোলি উত্সবকে বলে থাকেন ফাগুয়ার হোলি খেলা। বাংলা সংস্কৃতিতে হোলি উত্সবের বিভিন্ন ধর্মীয় দিক বর্ণনা করা হলেও হোলি উত্সব এখন ধর্মনিরপেক্ষ ও সার্বজনীনতায় পরিণত হয়েছে। বসন্তের আমেজে উত্সব-আনন্দে হোলি উত্সবে এখন মেতে ওঠেন সকলেই। হোলিকা দহনের দ্বারা শীতের শিশিরের সমাপ্তি এবং হোলি উত্সবের মধ্য দিয়ে বসন্তের সূচনা করে একে অন্যের মন-প্রাণে রঙের ছোঁয়া লাগিয়ে থাকেন সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষরা।