দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা দিনদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত গতকালের খবর অনুযায়ী গত শনিবার বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে কেবল বাগেরহাটেই নিহত হইয়াছে সাত জন। ময়মনসিংহ, পাবনা, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন স্থানে নিহত হইয়াছে আরো আট জন। অর্থাত্ এক দিনেই নিহত হইয়াছে ১৫ জন। ইহার আগে গত বৃহস্পতিবার কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে মোটরসাইকেল আরোহী তিন বন্ধুসহ বিভিন্ন স্থানে নিহত হয় ৯ জন। ইহা ছাড়া গত ৬ মার্চ হবিগঞ্জে হবু বরের পরিবারের ১০ জনসহ সারাদেশে নিহত হয় ২৬ জন। এইদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি বত্সর কেবল ফেব্রুয়ারি মাসেই ৩৮৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় সারাদেশে প্রাণ হারাইয়াছে ৪৬৩ জন এবং আহত হইয়াছে ৯৪৮ জন। জানুয়ারি মাসে ৩৪০টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা যথাক্রমে ৪৪৫ ও ৮৩৪ জন। আর বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির জরিপে দেখা যাইতেছে, চলতি বত্সরের ১০ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হইয়াছে ১ হাজার ১১৮ জন। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৮৫৫ জন। অর্থাত্ সড়কে মৃত্যুর মিছিলের গ্রাফটি ঊর্ধ্বমুখী।
বর্তমানে আমরা করোনা ভাইরাস লইয়া বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন; কিন্তু সড়কে প্রতিদিন যে, হারে প্রাণ ঝরিতেছে তাহাতে আমরা কি উত্কণ্ঠিত? একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও প্রতি বত্সর বা প্রতি মাসে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হয় না। এই দিক দিয়া আমরা আসলে একটি ‘যুদ্ধ’ পরিস্থিতির মধ্যে রহিয়াছি। এই পরিস্থিতি জাতীয় জীবনে ডাকিয়া আনিয়াছে ভয়াবহ দুর্যোগ। তাহার পরও প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত পরিবারের আহাজারি কি আমাদের কর্ণকুহরে পৌঁছাইতেছে? সড়ক আজ মৃত্যফাঁদে পরিণত হইলেও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ইতিপূর্বে গৃহীত সিদ্ধান্ত, সুপারিশ এমনকি আইনের বাস্তবায়নেও আমাদের আগ্রহ পরিলক্ষিত হইতেছে না। কোমলমতি শিশুরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়িয়া তুলিলেও মালিক-শ্রমিকদের আন্দোলন ও চাপের কাছে নতি স্বীকার করা হইতেছে বলিয়া অভিযোগ উঠিতেছে। সাধারণ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিকার পাইবেন কীভাবে? অবশ্য সড়ক দুর্ঘটনায় জনসচেতনতারও অভাব রহিয়াছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিতেছে অদক্ষ ও বেপরোয়া চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভাব বা ত্রুটিযুক্ত সড়ক, আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের কারণে। এখনো এই দেশে ড্রাইভারের সঠিক প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিত করা হইল না। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলিতে প্রয়োজনীয় ডিভাইডার নির্মাণ ও সাইন-সিম্বলের ব্যবস্থা করা গেল না। ফুটপাত ও ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করা গেল না। এই ব্যাপারে কি কোনো মেগা প্রজেক্ট হাতে নেওয়া যায় না? গাড়ির মানসম্মত বডি নির্মাণে সতর্কতা অবলম্বন করা যায় না? নসিমন-করিমন প্রভৃতি দেশীয় প্রযুক্তির যানবাহনগুলির প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া যায় না?
নিরাপদ সড়ক আইন, ২০১৮ বাস্তবায়নে আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এই আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হউক। দোষীদের শাস্তি দেওয়া হউক। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইতে গঠিত টাস্কফোর্সকে গতিশীল করা হউক।
