ইত্তেফাক রিপোর্ট
আমদানির নামে বিদেশে অর্থপাচার নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এমন আমদানির আড়ালে অর্থপাচার করছেন এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে এ প্রবণতা বেড়ে যায়। আবার দেশে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার অস্থিতিশীল হলেও এ প্রবণতা দেখা যায়। এসব কারণে আমদানির আড়ালে অর্থপাচার ঠেকাতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সমপ্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, আমদানির আড়ালে নানা কৌশলে একটি চক্র বিদেশে অর্থ সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই যেকোন এলসি (ঋণপত্র) খোলার আগে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হবে।
চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার অস্থিতিশীল। এর মূল কারণ ডলারের বিপুল চাহিদা। এই চাহিদা তৈরি হয়েছে বড় আকারের আমদানি বাণিজ্য থেকে। এ বিষয়ে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, যখন ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার সংকট ছিল, তখন থেকেই আমদানিতে এলসি খোলার ক্ষেত্রে আমরা সতর্কতা অবলম্বন করছি। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়, যাতে আমরা অপ্রয়োজনীয় আমদানিতে এলসি না খুলি। এ কারণে আমরা এলসি খোলার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করছি।
এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে আসা রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের গতি-প্রকৃতির দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। আমদানি ও রপ্তানির এলসি খোলার সময় বেশি ও কম মূল্য দেখানোর বিষয়ে সচেতন থাকতে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সজাগ থাকতে বলা হয়েছে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের ওই চিঠিতে। বিএফআইইউ’র প্রধান আবু হেনা মো. রাজী হাসান এ বিষয়ে বলেন, সাধারণত জাতীয় নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ব্যবহারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যাতে কেউ নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মূলধনি যন্ত্রপাতির (ক্যাপিটাল মেশিনারিজ) আমদানি যেভাবে বেড়েছে, সে হারে বিনিয়োগ হয়নি। এই প্রবণতাই বলে দেয়, মূলধনী যন্ত্রপাতির আড়ালে দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমদানি পর্যায়ে পাচারকৃত অর্থের বড় একটি অংশ যায় মূলত মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে। কারণ, এসব পণ্য আমদানিতে ন্যূনতম শুল্কহার থাকে। আর নির্বাচনের আগে এ প্রবণতা বাড়ে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম ইত্তেফাককে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের রপ্তানি ও আমদানির ধারা দেখলে দেখা যায়, এ দুটির মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য হচ্ছে না। আমদানির ক্ষেত্রে মূলধনি যন্ত্রপাতির বাইরে পেট্রোলিয়াম, খাদ্য পণ্য প্রভৃতি অনেক বেশি আমদানি হচ্ছে। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য রপ্তানি ও আমদানি করছে কিনা সে বিষয়টি খতিয়ে দেখার বিষয়টি সামনে আনেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর জুড়েই শিল্প স্থাপনে ব্যবহূত মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে ব্যাপকহারে। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ হাজার ৪৪৬ কোটি ডলার মূল্যের আমদানি হয়। এর মধ্যে শুধু মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি হয়েছে, এক হাজার ৪৫৬ ডলার। যা মোট আমদানির ২৫ শতাংশ। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি।
