বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার জীবনমন্থনজাত বিষ ও অমৃত

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২০, ১৯:১১

যতীন সরকার

“শেখ মুজিব ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়েছিলেন নিজের ঘোষণায় নয়, সংগ্রামী জনতার সস্নেহ এবং সকৃতজ্ঞ ইচ্ছার প্রকাশে। “এ কথা অবশ্যই ঠিক যে, শেখ মুজিবের ‘বঙ্গবন্ধু’ আখ্যাটিকে তার সমকালীন সাথী, অ-সাথিদের সকলে যে আনন্দের দৃষ্টিতে দেখেছে, এমন নয়। অস্বাভাবিকভাবে এই অখ্যাটিতে অনেকের মনে ঈর্ষার উদ্রেক হয়েছে। তাদের মনের ভাবটি এমন :এই অজ্ঞ লোকটিকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলার কী প্রয়োজন? এমন মনোভাবের অবচেতন অনুযোগটি হচ্ছে :আমাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ না বলে শেখকে বলা কেন? “তাই শেখ মুজিবকে আমরা ঈর্ষা করেছি। ঈর্ষা করেছি আমাদেরকে অতিক্রম করে বড়ো হওয়াতে। নানা দিকে বড়ো :তেজে, সাহসে, স্নেহে, ভালোবাসায় এবং দুর্বলতায়। সর্বদিকে এবং সেই ঈর্ষা থেকেই আমরা তাকে হত্যা করেছি। কেবল এই কথাটি বুঝিনি যে, ঈর্ষা পীড়িত হয়ে ঈর্ষিতকে হত্যা করে ঈর্ষিতের স্থান দখল করা যায় না।”

কথাগুলো লিখেছিলেন প্রখ্যাত প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট লেখক সরদার ফজলুল করিম, যিনি গত ১৪ জুন ২০১৪ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। সরদারের ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’ সংকলনে গ্রন্থিত ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ শীর্ষক প্রবন্ধটি আমি কয়েকবার পড়েছি। ঐ প্রবন্ধটি, বিশেষ করে উপরে উদ্ধৃত বাক্যনিচয় আমার ভাবনাকে বিশেষভাবে উজ্জীবিত করে তুলেছে। এই ভাবনার বৃত্তটিতে অবস্থান করেই আজ আমি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিকের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ করছি, জগত্ ও জীবন সম্পর্কে নিজের ভাবনাকে সংহত করে নিতে চেষ্টা করছি। আবার বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার কার্যকারণ সম্পর্কটিও অবলোকন করতে চাইছি সরদারের বক্তব্যের আলোকেই। একাত্তরের সাতই মার্চ প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর যে ভাষণ শ্রবণের স্মৃতি সরদার ফজলুল করিমেকে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ প্রবন্ধটি লিখতে উদ্বুদ্ধ করছিল, সেই ভাষণ কোটি কোটি বাঙালির মতো আমিও শুনেছিলাম। তবে রেসকোর্সের ময়দানের সেই অবিস্মরণীয় সমাবেশ বঙ্গবন্ধুর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে তার স্বকণ্ঠনিঃসৃত ভাষণ শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কারণ আমি মফস্সলবাসী। আমাকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে হয়েছিল রেডিওতে। তবে সেটি সাতই মার্চে নয়, পরদিন আটই মার্চ সকালে। সাতই মার্চ বিকেলে আমরা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার অধীর আগ্রহ নিয়ে বেতারযন্ত্রের সামনে বসে ছিলাম। কিন্তু সে-ভাষণটি যখন সরাসরি রেডিও থেকে প্রচার করতে দেওয়া হলো না, তখনই ঢাকা বেতারের সকল কর্মী বেতারকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসেন এবং জানিয়ে দেন যে, বঙ্গবন্ধুর পুরো ভাষণটি প্রচার করতে না দিলে তারা আর বেতারকেন্দ্রে ফিরে যাবেন না। তাদের এই অনমীয়তার কাছে নতি স্বীকার করে শাসন কর্তৃপক্ষ পরদিন সকালে সেই ভাষণটি প্রচার করতে দিতে বাধ্য হয়।

বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণকে কবি নির্মলেন্দু গুণ অত্যন্ত সংগতভাবেই ‘একটি কবিতা’ আখ্যা দিয়েছেন। তার ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কী করে আমাদের হলো’ শীর্ষক কবিতার শেষ পঙিক্তগুলোতে নির্মলেন্দু লিখেছেন,— শত বছরের সংগ্রাম শেষে/ রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/ অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।/ তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,/ হূদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার/ সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/ গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতাখানি:/ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’/ এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।/ সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

এই কবিতাটি যে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে বেরিয়ে এসেছিল, কিংবা এর রচয়িতা কেবল একা বঙ্গবন্ধুরই, তা কিন্তু নয়। হাজার বছর ধরেই বাঙালি তার হূদয়ের গভীরে এর ভাবটিকে ধারণ করে আসছিল। হাজার বছর ধরে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তরূপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল যে আকুতি, সেই আকুতিটিই সুুনির্দিষ্ট ও সংহত দিকনির্দেশনামূলক কথার মধ্যে রূপ পেতে চাইছিল। গণমনে যুগ যুগ লালিত সেই আকুতিটিই অস্ফুট ভাবনার নির্মোক ভেঙে অসীম শক্তিধর অবিনাশী কথামালার তথা কবিতা হয়ে বেরিয়ে এলো যার কণ্ঠ থেকে, সেই শেখ মুজিব শুধু তখন একজন কথাকার বা কবি হয়েই রইলেন না, হয়ে গেলেন সেই জনগোষ্ঠীর পরিত্রাতা ও ভয়ত্রাতা। তাই ‘নিজের ঘোষণা নয়’, তিনি ‘বঙ্গবন্ধু হয়ে গেলেন সংগ্রামী জনতার সস্নেহ ও সকৃতজ্ঞ ইচ্ছার প্রকাশেই’। বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছে এতদিন যা ‘ইচ্ছা হয়ে ছিল মনের মাঝারে’, সেই ইচ্ছাকে যিনি অমর কবিতায় রূপ দিলেন, তার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা-যে শতধারায় উত্সারিত হয়ে উঠবে,—তেমনটিই তো স্বাভাবিক। বঙ্গবন্ধু যে কবিতা রচনা করলেন তা তো বহুমাত্রিক। যে কোনো মহত্ কবিতার মতোই সেটি অভিধাকে অতিক্রম করে বহুমুখী ব্যঞ্জনায় ঋদ্ধ। সাতই মার্চের সেই কবিতাটিতে যেমন ছিল অনেক স্পষ্ট উচ্চারণ, তেমনই এতে সন্নিবিষ্ট হয়েছিল এমন ইঙ্গিতগর্ভ শব্দাবলি, যা ছিল স্পষ্ট কথার চেয়েও অনেক বেশি ব্যঞ্জনাবহ। প্রকৃত কবিতা তো মানুষের ভাষাকে অর্থের বন্ধন হতে ভাবের স্বাধীন লোকে পৌঁছিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধুর সেই অমর কবিতাটিও তা-ই করেছিল। সেই কবিতার ব্যঞ্জনায়  ‘রাজনৈতিক কৌশলের কাছে’ চূড়ান্ত মার খেয়েছিল ‘পাকিস্তানি জেনারেলদের রণকৌশল।’

স্বাধীনতাপ্রাপ্তির প্রায়-অব্যবহিত পরেই, ১৯৭২ সালে, মার্কিন সাংবাদিক ডেভিট ফ্রস্টের সঙ্গে এক সাংক্ষাত্সার বঙ্গবন্ধু তার ‘রণকৌশলটি’ স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন এভাবে— “৭ মার্চ যখন আমি ঢাকা রেসকোর্স মাঠে আমার শেষ মিটিং করি, ঐ মিটিংয়ে উপস্থিত দশ লাখ লোক দাঁড়িয়ে ‘আমার  সোনার বাংলা আমি তোমার ভালোবাসি’ গানকে স্যালুট জানাই এবং ঐ সময়ই আমাদের জাতীয় সংগীত চূড়ান্তরূপে গৃহীত হয়ে যায়...। “আমি জানতাম কী ঘটতে যাচ্ছে, তাই আমি ৭ মার্চ রেসকোর্স মাঠে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছিলাম এটাই স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য যুুদ্ধ করার মোক্ষম সময়।... “আমি চেয়েছিলাম, তারাই (অর্থাত্ পাকিস্তান সেনাবাহিনী) প্রথম আমাদের আঘাত করুক। আমার জনগণ প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত।”

জনগণ-যে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত ছিল তার স্পষ্ট প্রমাণ তারা রেখেছিল পাকিস্তানি শাসন কর্তৃপক্ষের আদেশ-নির্দেশ উপেক্ষা করে, বঙ্গবন্ধুর অসহযোগের ডাকে সাড়া দিয়ে, এবং ২৬ মার্চ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর আনুষ্ঠানিক অর্থেই মুক্তিযুদ্ধে নেমে পড়ে। সাতই মার্চে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর কবিতা-প্রতিম ভাষণই যে সে সময়কার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে উদ্ধুদ্ধ করেছিল, তারই প্রমাণ পাই সেই যুদ্ধের অন্যতম সৈনিক জিয়াউর রহমানের ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক লেখাটিতে (দৈনিক বাংলা’ ২৬ মার্চ ১৯৭২ এবং ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২-এ প্রকাশিত)।

তিনি লিখেছিলেন— “৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে তা জানালাম না। বাঙালি ও পাকিস্তানি সৈনিকদের মাঝেও উত্তেজনা ক্রমেই চরমে উঠেছিল।” পরবর্তীকালে জিয়ার চেলাচামুণ্ডারা যা-ই বলুন না কেন, ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে তার এই লেখাটিই! বঙ্গবন্ধু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন অনেক আগেই—বলতে গেলে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার গোড়া থেকেই। আওয়ামী লীগের অন্যতম স্থপতিরূপে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা ও কর্মের ধারাবাহিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তন করলেন স্বাধীন স্বদেশে। তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সাধারণভাবে বাংলাদেশের সকল মানুষের ভেতর বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটালেও ধূর্ত মতলববাজদের অনেকেরই তা মর্মবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়াল। স্বাধীনতা সশস্ত্র; সংগ্রাম চলাকালে ঘটনাক্রমে বা বিশেষ মতলব হাসিলের সচেতন উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিসংগ্রামী সেজেছিল যারা, তাদের কাছে অসনীয় হয়ে উঠল মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও জাতির অবিসংবাদিত নেতারূপে তার অধিষ্ঠান। তারা শুধু ঈর্ষাকাতরই হলো না, হয়ে উঠল হিংস্র। সেই হিংস্রতারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটাল পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট। ঈর্ষাকাতরতা থেকে হিংস্রতায় উপনীত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে যে, আমরাই হত্যা করেছি, সরদার ফজলুল করিম-কথিত এই মর্মান্তিক সত্যটিকে কোনোমতেই অস্বীকার করা যাবে না। যারা স্বাধীনতাসংগ্রামের সঙ্গে নানাভাবে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন, তারা সবাই এই ‘আমরা’র অন্তর্ভুক্ত। এরকম ‘আমরা’রই অন্তর্ভুক্ত বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী খোন্দকার মোশতাক ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরাও।

 

লেখক : বুদ্ধিজীবী ও প্রাবন্ধিক