ড. দেলোয়ার হোসেন
বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারাই স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি রচনা করেছে।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হানাদার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক গ্রেফতার এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির মিয়ানওয়ালা কারাগারে অন্তরিণ অবস্থা থেকে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে মুক্তি লাভের পর থেকে প্রতিটি মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু বাঙালির অবিংসবাদিত
নেতার গভীর কূটনৈতিক চিন্তাধারার
প্রতিফলন তুলে ধরেন
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কূটনীতি। আধুনিক বিশ্বে একটি জাতি বিনির্মাণ, একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি ও বিকাশের পেছনে রয়েছে কূটনীতির অসাধারণ ভূমিকা। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রশ্নে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক কূটনৈতিক তত্পরতা চালিয়েছে। স্বাধীনতার স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক, দার্শনিক ও মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণ ও গবেষণা হলেও বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ততটা গবেষণা হয়নি। অনস্বীকার্যভাবে বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারা ছিল গভীর, অনন্য ও অসাধারণ। সম্প্রতি বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু রচিত ‘আমার দেখা নয়া চীন’ (২০২০) একটি অসামান্য দলিল। বঙ্গবন্ধু রচিত অন্য দুটি গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (২০১২) ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ (২০১৭) বঙ্গবন্ধুর বিশ্বদর্শন ও পররাষ্ট্র চিন্তার দুর্লভ প্রমাণ রয়েছে। এগুলো গবেষকদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রচলিত অর্থে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা, সাক্ষত্কার, বিবৃতি সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নানাবিধ সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারার অন্যতম উত্স হিসেবে বিবেচিত।
বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারাই স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি রচনা করেছে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হানাদার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক গ্রেফতার এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির মিয়ানওয়ালা কারাগারে অন্তরীণ অবস্থা থেকে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে মুক্তি লাভের পর থেকে প্রতিটি মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু বাঙালির অবিংসবাদিত নেতার গভীর কূটনৈতিক চিন্তাধারার প্রতিফলন তুলে ধরেন। ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু বিস্ময়করভাবে এক মহান কূটনীতিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বাংলার মুক্তিসংগ্রামের অগ্রদূত স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারা প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি লাভের পর লন্ডনে যাত্রাবিরতি করে দিল্লি বিমানবন্দরে ভারতীয় সরকার ও জনগণ কর্তৃক সংবর্ধনা গ্রহণ করে লাখ লাখ অপেক্ষমাণ বাঙালির মধ্যে আবহমান বাংলার মাটিতে পদার্পণের যাত্রাকালটি একটি দুর্লভ আন্তর্জাতিক ঘটনা, যা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ পররাষ্ট্রনীতির জন্য বিশেষ তাত্পর্য বহন করে। লন্ডন ও দিল্লিতে বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে সাদরে গ্রহণ বিশ্ব পরিমণ্ডলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে অনেক উঁচুতে তুলে ধরে।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারার অসাধারণ ও বিস্ময়কর প্রতিফলন ঘটে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে লন্ডনের সংবাদ সম্মেলনে। পুরো সংবাদ সম্মেলনটি হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধুময়, বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি শব্দ হয়ে ওঠে বিশ্বনেতার বক্তব্য। সদ্য স্বাধীন জাতির মুক্তিপাগল মানুষের হূদয়ের কথা। বিশ্বের নিপীড়িত অসহায় মানুষের আর্তনাথের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। পৃথিবীর অগণিত শান্তিকামী মানুষের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি। সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য ও বিশ্বনেতার আচরণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গতি-প্রকৃতি নিধারণ করে। বঙ্গবন্ধুর আত্মবিশ্বাস, সাহস, দৃঢ়তা, বিচক্ষণতা ও বাঙালি জাতির প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা পরবর্তীকালে প্রতিটি কূটনৈতিক ঘটনায় প্রতিফলিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সহায়তাকারী রাষ্ট্রসমূহ যেমন ভারত ও তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির জনগণকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। প্রায় ৯ মাস কারাবন্দি এবং প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা গ্রেট ব্রিটেনের জনগণকে ধন্যবাদ জানানো একটি সাহসী ও কঠিন পদক্ষেপ। কারণ এ দেশগুলোর সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। বিশ্বের কাছে বঙ্গবন্ধুর চাওয়া ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান।
পাশাপাশি যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশটির মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানও ছিল, যা তিনি মানবতার দায়িত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। লন্ডনের হোটেল ক্লারিজে আয়োজিত সংবাদ সম্মলনের আগে বঙ্গবন্ধু ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়াড হিথের সঙ্গ দেখা করেন। হিথের সঙ্গে বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ সরকারের অকুণ্ঠ সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে হিথ বলেন, ‘আপনার জন্য আমরা আর কী করতে পারি?’ সদ্য কারামুক্ত এবং কঠিন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই সৌহর্দপূর্ণ আচরণ অতুলনীয়।
লন্ডন থেকে বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ রয়েল এয়ার ফোর্সের কমেট বিমানে চড়ে ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছে সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু আবার ধন্যবাদ জানালেন সব রাষ্ট্র ও সরকারকে, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পাশে ছিল। অন্যদিকে বিরোধিতাকারী রাষ্ট্রসমূহ যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের জনগণ রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজকেও ধন্যবাদ জানান। প্রধনামন্ত্রীর দায়িত্ব
গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেন ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২। এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ইঙ্গিত দিলেন ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্কের মূলনীতি ও কূটনৈতিক কাঠামোর। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের উদ্দেশে বলেন, বাংলাদেশ হবে এশিয়ার সুইজারল্যান্ড। শান্তি ও মানবতাবোধ দ্বারা পরিচালিত হবে বাংলাদেশের কূটনীতি। বঙ্গবন্ধু বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার ও দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত পরিষ্কার—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয় (Friendship to all malice towared None)। বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত কূটনীতির কাঠামো ধরেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত এক দশকে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান করেছেন শক্তিশালী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করলে আরো কয়েকটি বিষয় আমাদের সামনে চলে আসে।
প্রথমত এটি অনস্বীকার্য যে বঙ্গবন্ধু তার স্বল্প সময়ের শাসনামলে নজিরবিহীন কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছেন। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে কারামুক্তির লক্ষ্য থেকেই বঙ্গবন্ধুকে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছিল। পাকিস্তানের নতুন শাসক জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে ইরানের রাজধানী তেহরান হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছার অনুরোধ করেন, যা বঙ্গবন্ধু প্রত্যাখ্যান করেন এবং শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক নেতৃত্বের এক নতুন যুগ। বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক বিজয়ের কয়েকটি বড়ো ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথমত, বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন দ্রুততায় ১২ মার্চ ১৯৭২ সালে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সব সদস্য বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনের একটি। দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধু সরকারের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন, অর্থাত্ নিক্সন প্রশাসনের যোগাযোগ, যার ফলে ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিক্সন প্রশাসনকেই দিতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায়। তৃতীয়ত, ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য আলজেরিয়া সফর করেন। এই সফরে তৃতীয় বিশ্বে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়, তেমনি বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই বিশ্বের ১০০ রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন কমনওয়েলথ আইএলও আইএমএফ, আইবিআরডি, ইউনেস্কোসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে।
বঙ্গবন্ধুর কূটনীতির আরেকটি বিজয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু ইসলামি সম্মেলন সংস্থার চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য পাকিস্তান সফর করেন। পঞ্চমত, ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তি বাংলাদেশের একটি বড়ো কূটনৈতিক অর্জন। ষষ্ঠত, ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলা ভাষায় ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণ বাংলাদেশের কূটনীতির একটি দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করে। এমনকি এই ভাষণকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মানবতাবাদের গুরুত্ব প্রদানের একটি ঐতিহাসিক দলিল।
তাছাড়া ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি; ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। বাংলাদেশের কূটনীতির মাইলফলক এ ঘটনাগুলো। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বড়ো অর্জনের এ সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারার বাস্তব প্রতিফলন। বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির কল্যাণ ও জাতীয় স্বার্থের ভাবনার পাশাপাশি মানব জাতির মঙ্গলের কথা ভেবেছেন। বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারায় এর প্রতিফলন ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে। এ পর্যায়ে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্র উল্লেখ করা যেতে পারে।
বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা :বঙ্গবন্ধুর বিশ্ববীক্ষায় শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য কূটনীতি প্রয়োজন আর কূটনীতির প্রধান উপলক্ষ্য হচ্ছে শান্তি। সম্প্রতি প্রকাশিত বঙ্গববন্ধু রচিত গ্রন্থ ‘আমার দেখা নয়া চিন’-এ শন্তির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯৫২ সালে বঙ্গবন্ধু পিকিং সফর করেছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর শান্তি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রদত্ত ভাষণে শান্তির বিষয়টি কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ‘মানব জাতির অস্তিত্ব নির্ভর করে শান্তির ওপর। সমগ্র বিশ্বে মানুষের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে শান্তি। শান্তি স্থায়ী হতে পারে কেবল ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে।’ বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে সহাবস্থানের কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি সমগ্র পৃথিবীকে দেখাতে চাই যে বাঙালি শুধু রক্ত দিতে জানে না, শান্তিকামী বাঙালি জানে কীভাবে শান্তি বজায় রাখতে হয়।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক ভয়াল কালরাতে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। দেশি ও বিদেশি গভীর রাজনৈতিক যড়যন্ত্ররে শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু শাহাদতবরণ করলেও বঙ্গবন্ধুর দর্শন, চিন্তা ও বিশ্ববীক্ষা বাঙালি জাতির জন্য পাথেয় হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও সম্পর্কের জন্য ভিত্তি হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় বিশ্ব পরিমণ্ডলে বঙ্গবন্ধুকে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, ১৯৭৩ সালে বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধুকে ‘বিশ্ববন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়, যা ইতিহাসে অনন্য।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত্ লাভের পর মহান বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর বিখ্যাত উক্তি, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি।’ বঙ্গবন্ধুকে পৃথিবীর অগণিত মানুষের কাছে বিশ্বনেতার আসনে অধিষ্ঠিত করে। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারা নিয়ে আরো গবেষণা হওয়া উচিত। বাংলাদেশের সব ধরনের কূটনীতির মৌলিক ও শক্তিশালী ভিত্তি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা, যা কালোতীর্ণ এবং সর্বদা প্রাসঙ্গিক। বিশ্ব আজও ব্যাপক বৈষম্যের আবর্তে নিমজ্জিত। উগ্র জাতীয়তাবাদ, সন্ত্রাসবাদ, অভিবাসনবিরোধিতা, বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং সংকীর্ণতা বিশ্বকে যখন অন্ধকারের দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, তখন মানবতা ও বিশ্বশান্তির দর্শন আরো বেশি প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চিন্তাধারা আমাদের জন্য আরো বেশি প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
