কেরানীগঞ্জে দখল চাঁদাবাজি ভাঙচুর উচ্ছেদে আতঙ্ক

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২০, ২০:৩৫

থানায় মামলা, দুই জন গ্রেফতার ১৮ একর সরকারি জমি উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি

ইত্তেফাক রিপোর্ট

অভিনব ঘটনা ঘটছে ঢাকার পার্শ্ববর্তী কেরানীগঞ্জে। স্থানীয়দের জমি দখল, বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ, মাদকের ব্যবসা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী চক্র। চক্রের সদস্যরা স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল। ‘কাজ তুলে দেওয়া’র যোগ্যতা অনুযায়ী চক্রের দুই শতাধিক সদস্য মাসে ‘সম্মানি’ পান সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই চক্রের ভয়ে নিজেদের জমি ছেড়ে স্থানীয়দের অনেকে এলাকা ত্যাগ করে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। পালিয়ে থাকা কয়েক জন ঢাকায় গোপনে কথা বলেছেন গণমাধ্যমের কয়েক প্রতিনিধির সঙ্গে। তুলে ধরেছেন এলাকার ভয়ংকর চিত্র।

ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সিদ্দিকের অভিযোগ, এই মোটরসাইকেল বাহিনীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে তিনি হামলার শিকার হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাননি। কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় গত ৪ মার্চ এরকমই এক ঘটনায় থানায় মামলা করেন ‘কাঠালতলী গ্রীন সিটি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন। মামলার এজাহারে দেলোয়ার অভিযোগ করেন, তার হাউজিং কোম্পানির অফিস নির্মাণকালে গত ৩ মার্চ হাবুিবর রহমান হাবিবের বাহিনী এসে বাধা দেয়। একটি মাইক্রোবাস ও ২০-২২টি মোটরসাইকেল যোগে এসে তারা লাঠিসোটা, রড, রামদা ও চাপাতি নিয়ে তার অফিসে প্রবেশ করে। তাকে না পেয়ে তারা তার অফিসের স্টাফ কাইয়ুম ও নাছিরসহ নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের অফিস থেকে বের করে দেয়। হাউজিং প্রকল্পের ভেতরে গ্রীল, নির্মাণকাজের সরঞ্জাম ও দেওয়াল ভাঙচুর করে তারা। এতে তার ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়। যাওয়ার সময় ভাঙচুরকারীরা এই বলে হুমকি দিয়ে যায়, দেলোয়ারকে পেলে মেরে ফেলা হবে।

 তার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কেরানীগঞ্জ মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর রেজাউল জানান, মামলার আসামিদের এরই মধ্যে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দেলোয়ার জানান, মামলার পরদিন কিছু লোক তার বাড়িতে গিয়ে তাকে খোঁজ করে। তাকে না পেয়ে তার বাবাকে হুমকি দিয়ে যায়। আতঙ্কে তার বৃদ্ধ বাবা স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি জানান, তার মতো বেশ কয়েকজন এখন এলাকাছাড়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জের কাঠালতলী, বেলনা, নয়াগাঁও ও খাসকান্দি—এই চারটি গ্রামের লোকজন মিলে গত বছরের জানুয়ারিতে ‘কাঠালতলী গ্রীন সিটি’ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। নিজেদের ও আত্মীয়-স্বজনদের জমি মিলে প্রায় ৫০০ বিঘা জমি নিয়ে তারা হাউজিং প্রকল্প শুরু করে। সেখানে সাইনবোর্ড দেন। তিন মাস পর ‘মধু সিটি’ নামের আরেকটি হাউজিং কোম্পানির লোকজন গিয়ে কাঠালতলী গ্রীন সিটির সাইনবোর্ড তুলে ফেলেন। এই ঘটনায় থানায় জিডি করতে গেলেও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন দেলোয়ার। জানা গেছে, মধু সিটির মালিক তিন ভাই সলিম, হাবিব ও আমিন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সলিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘একটি দুষ্ট চক্র তার এবং মধু সিটির বদনাম করতে এসব রটাচ্ছে। যে জায়গার কথা বলা হচ্ছে সেটি মধু সিটির সম্পত্তি। এই জায়গায় প্রকল্প করার জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে মধু সিটিকেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে মধু সিটির বিরুদ্ধে বুড়িগঙ্গার শাখা নদী, খাল ও সরকারি খাস জমি বেদখলেরও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ঢাকার জেলা প্রশাসককে লেখা এক চিঠিতে বলা হয়, ‘মধু সিটি রিভারভিউ হাউজিংয়ের দখলকৃত বুড়িগঙ্গা শাখা নদীর, তিনটি খাল ও চলাচলের তিনটি রাস্তাসহ মোট ১৮ একর জমি উদ্ধার ও দখলকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।’

এ ব্যাপারে মধু সিটির অন্যতম মালিক সলিম ইত্তেফাককে বলেন,‘স্থানীয় একটি চক্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েছিল। পরে ডিসির কার্যালয় সবকিছু মেপে কোনো অনিয়ম পায়নি।’