আজ সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ! শতবর্ষ পূর্বে আজিকার দিনে মধুমতীর তীরে টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম লইয়াছিলেন এক বিস্ময়পুরুষ! ক্ষণজন্মা এই পুরুষ আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—মাত্র ৫৫টি বত্সর পাইয়াছিলেন বাংলার দুঃখী ভুখানাঙ্গা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। ইহার জন্য তাহাকে কারাভোগ করিতে হইয়াছিল ৪ হাজার ৬৮২ দিন! তাহাকে ফাঁসিকাষ্ঠে চড়াইবার ষড়যন্ত্রও হইয়াছে একাধিকবার; কিন্তু কোনোভাবেই তাহাকে বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা হইতে লক্ষ্যচ্যুত করা যায় নাই।
বঙ্গবন্ধুর মতো দিগন্তপ্রসারী হূদয় আর অমল-অসীম-অধরা নীলাকাশ জুড়িয়া ছড়ানো কর্মের দ্যুতি এই বাংলায় আর কাহারো নাই। তাহার বুকের মাপ যেন ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের সমান! এই জন্য শামসুর রাহমান লিখিয়াছেন—‘দেখ, প্রত্যেকটি মানুষের মাথা/ তোমার হাঁটুর চেয়ে এক তিল উঁচুতে উঠতে পারছে না কিছুতেই।’ তিলে তিলে জমা হওয়া পাকিস্তানের পর্বতসম অনাচারের চূড়ান্ত জবাব তিনি দিয়াছিলেন মুক্তিসংগ্রামের ভিতর দিয়া। তাহার এমনই জাদুকরি শক্তি যে, চূড়ান্ত মুক্তির আন্দোলনকালে বাংলার দামাল ছেলেদের মনোজগতে তিনি একটি মুজিব হইতে পরিণত হইয়াছিলেন লক্ষ মুজিবে। বঙ্গবন্ধুকে লইয়া অন্নদাশঙ্কর রায় বলিয়াছেন—‘দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা/ রক্তগঙ্গা বহমান/ নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়/ জয় মুজিবুর রহমান।’ মানুষের হূদয় উজাড় করিয়া ভালোবাসিবার মতো এমন মহান নেতা কি আর কখনো জন্মাইবে এই পলিবিধৌত অপূর্ব বদ্বীপে? যাহার দেহমন জুড়িয়া ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধ, পলিমাটির মতো নরম আদুরে ছিল যাহার কোমল হূদয়! যেই দেশের রাতজাগা নক্ষত্র আর চাঁদের হাসি-কান্নায় জড়াইয়া রহিয়াছে আবেগের ফল্গুধারা—সেই দেশটিকে অনুধাবন করিতে হইলে সকলের পূর্বে অনুধাবন করিতে হইবে শেখ মুজিবকে।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ভিতর দিয়া নূতন করিয়া যেই অন্ধকার সময়ের সূচনা ঘটানো হইয়াছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়া ঘাতকরা দম্ভের সহিত ভাবিয়াছিল, ইতিহাসের পাতা হইতেও মুছিয়া ফেলিতে পারিবে বঙ্গবন্ধুর কীর্তি; কিন্তু খুনিরা জানিত না—বঙ্গবন্ধু একজন ব্যক্তিমাত্র নহেন, তিনি এই রূপসি বাংলার আদর্শ ও স্বপ্নের প্রতীক। কখনোই হত্যা করা যায় না এই আদর্শকে। মানুষ কখনোই সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠিতে পারে না। বঙ্গবন্ধু নিজেই তাহার আত্মসমালোচনা করিয়া ১৯৭৫ সালের ১৯ জুন বলিয়াছেন—‘আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই, আমি মানুষ, আমি ভুল করবই।’ এই জন্যই তিনি রক্তমাংসের মহামানব! তিনি আমাদের আত্মপরিচয়ের জনক, তিনি আমাদের উপহার দিয়াছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ‘পাসপোর্ট’। তিনি এক সার্থক মানুষ! বস্তুতপক্ষে, শেখ মুজিব এমনই এক মহাসিন্ধু, বাংলার আকাশ-বাতাস সর্বব্যাপী তাহার এমন বিস্তার যে, তাহাকে অধ্যয়ন অনুশীলনেও শেষ করা যাইবে না। আমৃত্যু তিনি যেই সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়াছেন, তাহার মূল কথা হইল—বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ও মর্যাদাবান জাতি হিসাবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করিয়া বাঁচা। বঙ্গবন্ধুর জন্যই বাংলাদেশ আজ একটি সমৃদ্ধ আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র।
এই অসংবাদিত মহান নেতার জন্মদিনের শতবর্ষে সকলকে জানাই প্রীতি সম্ভাষণ, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। জয় মুজিবুর রহমান।
