অচ্ছুত নারীর অদ্ভুত ক্ষমতা

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২০, ১৯:১৪

এক গবেষণায় জানা গেছে, আমাদের দেশের শতকরা ৩৬ জন মেয়েই প্রথম ঋতুস্রাবের আগে ঋতুস্রাব সম্পর্কে জানে না। ঋতুস্রাব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নারী-পুরুষ উভয়েরই থাকা প্রয়োজন। ঋতুস্রাব/ মাসিক/ পিরিয়ড/ মিনসট্রে/ হায়েজ/ শরীর খারাপ যেই নামই বলি না কেন এটি হচ্ছে নারীর স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। ঋতুস্রাব নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রাকৃতিকভাবে এটি শুরু হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পরে এটি শেষ হয়ে যায়। মেয়েদের সারা জীবন ধরেই ঋতুস্রাব নিয়ে সমাজের অর্থহীন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শুনে যেতে হয়। যেমন: ঋতুস্রাব একটি ভয়ংকর, বিদঘুটে ও লজ্জাজনক সমস্যা; ঋতুস্রাবের রক্ত খুবই নোংরা অর্থাত্ অপবিত্র; কাপড়ে ঋতুর রক্তের দাগ লেগে যাওয়া খুবই লজ্জার ব্যাপার; ঋতুমতি মেয়েরা অপরিচ্ছন্ন, অচ্ছুত এবং অপবিত্র, যার ফলে তারা গাছে পানি দিলে গাছ মরে যাবে, শাকসবজি-ফলমূল-দুধ-আচার— এসবে হাত দিলে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে, রান্নাঘরে উপস্থিত থাকলে ভাপাপিঠা জোড়া লাগবে না ইত্যাদি আরো অনেক কিছু।

ঋতুস্রাবের সময় একটি মেয়ে সামান্য অস্বস্তি বা ব্যথায় ভুগতে পারে যা খুবই স্বাভাবিক, তাই এটি কোনো অসুখ বা রোগ নয়। ঋতুস্রাব যখন নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে হয় তখন তাকে মাসিক বা ঋতুচক্র বলে। একজন নারীকে ভবিষ্যতে সন্তানসম্ভবা হতে শারীরিকভাবে প্রস্তুত করে এই ঋতুচক্র। ঋতুচক্র শুরু হওয়ার মাধ্যমে একজন নারী মা হওয়ার অপূর্ব ক্ষমতা অর্জন করে। এইবার আসি ঋতুস্রাবভিত্তিক কিছু বিজ্ঞানসম্মত আলোচনায়। ঋতুস্রাব হলো মেয়েদের প্রজননতন্ত্রের জরায়ুর আস্তরণের স্বাভাবিক স্খলন। জরায়ুর ভেতরের দেওয়ালে একটি স্তর থাকে যেখানে ভ্রূণ গিয়ে সংযুক্ত হয়। যখন এই স্তরটি খসে পড়ে, তখন কিছু রক্তসহ তা বেরিয়ে যায়, এটাই ঋতুস্রাব। ঋতুচক্রের সময় শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে এসট্রোজেন এবং প্রজেসটেরোন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো শরীরকে গর্ভধারণের জন্য তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করে। শরীরের প্রজননতন্ত্র যে সঠিকভাবে কাজ করছে, তার প্রমাণ হলো ঋতুচক্র। বিজ্ঞান বলছে এই ঋতুস্রাবের রক্তগুলো পেটে থাকা অনাগত সন্তানের খাবার সরবরাহ করে। তার মানে এই দাঁড়ায় যে, পৃথিবীর প্রতিটি মানব সন্তান তার মায়ের ঋতুস্রাবের অস্তিত্ব নিজের শরীরে বহন করে। তাহলে তো রক্ষণশীল সমাজের লজিক অনুযায়ী সমগ্র মানবজাতিই এখন অশুচি, অচ্ছুত, অপরিচ্ছন্ন ও অপবিত্র।

ঋতুস্রাব গড়ে প্রতি ২৮ দিন অন্তর অন্তর হয়। যদিও একেক জনের ক্ষেত্রে সময়ের তারতম্য ভিন্ন হতে পারে।  কারো কারো ক্ষেত্রে ২২-৪৫ দিনের মধ্যে হয়ে থাকে। ঋতুস্রাবের সময় রক্তপাতের সময়কাল সচরাচর ৩-৫ দিন স্থায়ী হয়। অনেকের ক্ষেত্রে কিছু কম-বেশিও হতে পারে। প্রতি ঋতুচক্রের সময় সাধারণত ১০ থেকে ৩৫ মিলিলিটার পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়। ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই নারীর ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণু তৈরি হতে শুরু করে। প্রতি মাসে ঋতুচক্রের সময় পেটে হালকা ব্যথা অনুভূত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে এই সময় তীব্র ব্যথা অনুভব করলে তাকে ডিসমেনোরিয়া বলে।

আমাদের দেশের চল্লিশ শতাংশ কিশোরী ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে স্কুলে আসতে চায় না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এখনো প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ মেয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে না। নেপালে ঋতুস্রাব নিয়ে ‘চৌপদি’ নামক এক অমানবিক প্রথা সুদীর্ঘকাল ধরে চালু ছিল। এই প্রথা অনুযায়ী ঋতুস্রাব চলাকালে নারীদের ঠাঁই হতো অস্বাস্থ্যকর, নির্জন কোনো কুঁড়েঘর কিংবা গোয়ালঘরে। ফলে অনেক নারীকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যপ্রাণীদের আক্রমণে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। ২০১৭ সালে নেপালের সংসদে আইন পাশ করে এই প্রথা নিষিদ্ধ করা হয় এবং এই প্রথার সঙ্গে সংযুক্ত ব্যক্তিদের তিন মাসের জেল ও ৩ হাজার নেপালি রুপি জরিমানার বিধান করা হয়।

২০০১ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ঋতুস্রাব চলাকালে ছাত্রীদের স্কুল ছুটি ও নারী কর্মীদের অফিস ছুটি দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই নারীদের জন্য তিন দিনের ঋতুকালীন ছুটি দেওয়া শুরু করে জাপান। ২০১৩ সাল থেকে তাইওয়ান তিন দিনের ঋতুকালীন ছুটি দেওয়া শুরু করে। আর ২০১৬ সাল থেকে চীনের কিছু সংস্থা নারীদের এই ছুটি দেওয়া শুরু করে। ২০১৭ সালে ভারতের একটি ডিজিটাল মার্কেটিং কোম্পানি ও মুম্বাইয়ের  অপর এক কোম্পানি তাদের নারী কর্মীদের এই ছুটির কথা ঘোষণা করে। এ তো গেল সাম্প্রতিক সময়ের কথা। ১৯৮৮ সালে ভারতের কেরালা সাহিত্য একাডেমি থেকে ‘কেরালা ইন দ্য নাইনটিন্থ সেঞ্চুরি’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। লেখক পি. ভাস্করানুন্নি তাতে লেখেন যে, ১৯১২ সালে বর্তমান এর্নাকুলাম জেলার ত্রিপুনিথুরার গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল তার ছাত্রীদের জন্য ঋতুকালীন ছুটির ঘোষণা দিয়েছিল। ভারতের কেরালার এই স্কুলটি প্রায় এক শতাব্দী আগে থেকে স্কুলছাত্রীদের ঋতুকালীন ছুটি দিয়ে আসছে। আর বাংলাদেশের নারীদের জন্য ঋতুকালীন ছুটি এখনো স্বপ্নের অতীত।

 

ছবি : ইন্টারনেট