গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার ও জননিরাপত্তা

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২০, ২১:২৬

গত বত্সর রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে এক গ্যাসবেলুন বিক্রেতার গাড়িতে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণে মুহূর্তেই ঝরিয়া যায় সাত শিশুর তাজা প্রাণ। শিশুরা বেলুন ক্রয়ের জন্য ঐ ভ্যানগাড়িটিকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়াছিল। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটির স্মৃতি রাজধানীবাসী এখনো ভুলিতে পারেন নাই। ইহার পরও একের পর এক গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়াই চলিয়াছে। বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত, দোকানপাট, গ্যাস সিলিন্ডারবাহী গাড়ি—সর্বত্র ঘটিতেছে এই ধরনের দুুর্ঘটনা। কিছুদিন পূর্বে গোপালগঞ্জে প্রাইভেটকারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত হয় পাঁচ জন। এইভাবে সারাদেশে সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা বলিতে গেলে লাগিয়াই আছে। বাসাবাড়ি বা যানবাহনে থাকা সিলিন্ডারগুলি অনেক ক্ষেত্রে যেন এক-একটা বোমায় পরিণত হইয়াছে। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ নিরুত্সাহিত করিবার পর এবং দেশে নগরায়ণের হার বৃদ্ধিতে সংগত কারণে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের হার বাড়িতেছে। ইহার সহিত পাল্লা দিয়া বাড়িতেছে গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনাও; কিন্তু এই দুর্ঘটনা রোধে গ্যাস সিলিন্ডার উত্পাদন, বাজারজাত ও বিক্রয়ের সুষ্ঠু নীতিমালা গ্রহণ জরুরি হইলেও এই বিষয়টি আজও অবহেলিত হইয়া আসিতেছে।

আমাদের উদ্বেগের বড়ো কারণ হইল, দেশের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও অলিগলিতে আজ যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিক্রয় হইতেছে গ্যাস সিলিন্ডার। এই সকল সিলিন্ডার কোনটা কতটুকু নিরাপদ তাহা সাধারণ মানুষের পক্ষে বুঝা সম্ভব নহে। কঠোর সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিরাপদভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ করিবার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্সের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণেও এই দেশে হতাহতের ঘটনা ঘটিতে দেখা যায়। বিভিন্ন যানবাহনে সিএনজি বা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার শুরু হয় বায়ুদূষণ রোধের নিমিত্ত। এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ছিল এমনটি বলিবার অবকাশ নাই; কিন্তু কয়েক বত্সর পরপর সিলিন্ডার পরীক্ষানিরীক্ষা করিবার যে বিধান আছে, তাহা ঠিকমতো অনুসৃত হয় না। মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করা হইলেও এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। গতকাল সহযোগী একটি জাতীয় দৈনিকে বলা হইয়াছে—মুন্সীগঞ্জে যত্রতত্র বিক্রয় হইতেছে গ্যাস সিলিন্ডার। এমনকি রড, সিমেন্ট, ক্রোকারিজ ও মুদি দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিক্রয় হইতেছে এলপি গ্যাস। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এলপি গ্যাস বিক্রয় করিলে লাইসেন্স নিতে হয়, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠানে থাকিতে হয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র; কিন্তু এই সকল নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইয়াই এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা চালাইয়া যাইতেছেন একশ্রেণির ব্যবসায়ী।

অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপক আইন, ২০০৩-এর ৪ ধারা অনুযায়ী এই ধরনের জ্বালানি মজুত প্রক্রিয়াকরণের জন্য লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। অন্যথায় আইনের ১৭ ও ১৮ ধারা অনুযায়ী তিন বত্সরের কারাদণ্ড ও দোকান বা স্থানে সংরক্ষণ করা মালপত্র বাজেয়াপ্ত করা হইবে। বিভিন্ন কোম্পানির ডিলারদের উচিত এই ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা। গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন ও সংরক্ষণেও দরকার সচেতনতা। আমাদের মনে রাখা দরকার—সকল ধরনের উচ্চচাপের গ্যাস সিলিন্ডার যেমন—হিলিয়াম, এলপিজি, সিএনজি ও হাইড্রোজেন সতর্কতার সহিতই আমাদের ব্যবহার করিতে হইবে। বাংলাদেশ বিস্ফোরক পরিদপ্তর এই সকল সিলিন্ডারের মান নিশ্চিত করিতে ব্যাপক উদ্যোগ লইবে বলিয়া আমাদের প্রত্যাশা। দেশে এখন ২ কোটিরও অধিক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহূত হইতেছে। সুতরাং জননিরাপত্তায় বিষয়টিকে অবহেলার চোখে দেখিবার কোনো সুযোগ নাই।