করোনা ভাইরাস আতঙ্কে

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২০, ২১:২৭

ড. মো. রওশন আলম

আমাদের এই পৃথিবী এখন একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একটি আতঙ্কিত ভাইরাসের বাতাস বইছে আজ পৃথিবীব্যাপী। যে ভাইরাসের নাম করোনা ভাইরাস ২০১৯ বা কোভিড-১৯। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, উন্নত-অনুন্নত বলে কাউকে রেহাই দিচ্ছে না এই ভাইরাস। থমকে দাঁড়িয়েছে এ পৃথিবী।

 আমেরিকাতে রাতেও শহর ব্যস্ত থাকে। ডাউনটাউনগুলোতে নাইটলাইফ শুরু হয়। অধিকাংশ শহরে সেই নাইটলাইফ তথা রেস্টুরেন্ট, বার, পাব, নাইটক্লাব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সাড়া দেশে ট্রাভেল রেসট্রিকশন জারি হয়েছে। ঘন জমায়েত, পার্টি, কনফারেন্স এড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমেরিকান, ইউএস, ডেলটা, জেটব্লু-সহ ইন্টারনাল ফ্লাইটগুলো যেমন শিডিউল পরিবর্তনে হিমশিম খাচ্ছে, তেমনি ইউরোপসহ বহির্বিশ্বের কিছু দেশ থেকেও ফ্লাইট আসা বন্ধ রাখা হয়েছে। যারা বাহির থেকে দেশে ফিরছে তাদেরও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। নিউ ইয়র্কের গভর্নর এন্দ্রু কুমো শহরটিকে পুরো শাট ডাউন ঘোষণা করেছেন। 

আমি ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টন শহরে থাকি। এই স্টেটের অবস্থাও ভালো নয়। এখনো মৃত্যু না ঘটলেও করোনা আক্রান্তের দিক থেকে ম্যাসাচুসেটসের অবস্থান উপরের দিক থেকে চতুর্থ স্থানে। মোট ১৯৭ জন। এখানে বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড, এমআইটি, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস, বোস্টন ইউনিভার্সিটিসহ প্রায় সকল ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের কাজের পরিধি সীমিত করে এমপ্লয়িদেরকে ঘরমুখী থাকার নির্দেশ দিয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বোস্টনে মৌচাকে ঢিল ছোড়ার মতো একটি ঘটনা করোনা ভাইরাসকে ছড়িয়ে দিয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি বোস্টন ডাউনটাউনের মারিওট হোটেলে ছিল বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালের সিনিয়র এমপ্লয়িদের একটি কনফারেন্স। সেখানে যোগদান করেন আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ইউরোপের দেশগুলো থেকে আসা বায়োজেনের সিনিয়র এমপ্লয়িরা। তারা সেখানে আনন্দঘন পরিবেশে হ্যান্ডশেক, হাগ, ডিনার পার্টি সেরে বাসায় ফেরেন বা রাতের ফ্লাইটে রিটার্ন করেন। সেই কনফারেন্সে ইতালিরও দুজন সায়েন্টিস্ট ছিলেন তারাও দেশে ফেরেন এবং অসুস্থ বোধ করেন। এক দিন পরেই জানা গেল, যে এমপ্লয়িরা ঐ কনফারেন্সে যোগদান করেছিল, সবাইকে কোয়ারান্টাইনে যেতে বলা হয় এবং ঐ এমপ্লয়িদের সংস্পর্শে ইতিমধ্যে অন্য যারাই এসেছেন, তাদেরও করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করা হয়। কদিনের মধ্যেই আরো জানা গেল যে, ম্যাসাচুসেটসে প্রথম যে ১০৮ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ৮২ জনই ছিল ঐ বায়োজেন কনফারেন্সের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত বা সম্পৃক্ত। এই ঘটনার পর ম্যাসাচুসেটসেও স্টেট অব এমারজেন্সি ঘোষণা করা হয়। ঘন জমায়েত তো নয়ই, বরং একে অপর থেকে ন্যূনতম ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলার নির্দেশ জারি করা হয়।

করোনা ভাইরাস ইউরোপের দেশগুলোতেও হিট করেছে ব্যাপকভাবে। গত রবিবার এক দিনেই ইতালিতে এই ভাইরাসের কারণে মারা গেছে সর্বাধিক ৩৬৮ জন এবং সোমবার ৩৪৯ জন। এ নিয়ে ইতালিতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ২ হাজার ১৫৮। আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সেখানে ২৭ হাজার ৯৮০ (মার্চ ১৬)। স্পেনের ওপর দিয়েও করোনা ভাইরাসের ঝড় কম বয়ে যাচ্ছে না। আক্রান্ত ৯ হাজার ১৯১ জনের মধ্যে সেখানে মৃত্যু ঘটেছে এযাবত্ ৩০৯ জনের (মার্চ ১৬)। জার্মানির সঙ্গে ইউরোপের যে ৯টি দেশের বর্ডার রয়েছে, তার মধ্যে পাঁচটি দেশের সঙ্গে (ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, লুক্সেমবার্গ ও অস্ট্রিয়া) বর্ডার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে।

 আফ্রিকার দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৩০টিতেই এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। বলা যেতে পারে যে, পৃথিবীতে সব প্রান্তেই এখন এই ভাইরাসের প্রসার ঘটেছে। এবং এর মোকাবিলা করতে দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে। সমগ্র চীনে এ পর্যন্ত ৮০ হাজার ৮৮১ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে মৃত্যু ঘটেছে ৩ হাজার ২২৬ জন এবং সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৬৮ হাজার ৬৯০ জন (মার্চ ১৬ পর্যন্ত)। এই রোগের ভ্যাক্সিন নির্ণয়ে আমেরিকাতে এনআইএইচ (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ) ও মডার্ন থেরাপিউটিকস ক্লিনিক্যাল স্টাডি অব্যাহত রেখেছেন। কবে মানুষের হাতে এর প্রতিষেধক এসে পৌঁছাবে তা আমাদের জানা নেই। তবে অচিরেই সায়েন্টিস্টদের নিরলস প্রচেষ্টা যে সফল হবে এবং দুনিয়াব্যাপী এই প্যান্ডেমিক পরিস্থিতিকে তারা জয় করবেন, সে আশাবাদ আমরা রাখতেই পারি। 

n লেখক :বোস্টনের একটি ফার্মাসিউটিক্যাল

ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত