শিশুশ্রমকে না বলি

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২০, ২১:৫৩

ফারহানা নওশিন তিতলী

একটি শিশু পরিবারে এনে দেয় অনাবিল সুখ-শান্তি। শিশু মানেই একটি পরিপূর্ণ পরিবার। বাবা-মায়ের কাছে তাদের কাঙ্ক্ষিত শিশুটি যেন চোখের মনি। সচ্ছল বা ধনিক শ্রেণির পরিবারের প্রতিটি সদস্য শিশুটিকে পরম যত্ন ও আদর ভালোবাসা দিয়ে লালন পালন করে। খাবার, চিকিত্সা থেকে শুরু করে শিশুর স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাপার যেন বাবা-মার কাছে সবচেয়ে জরুরি কাজ। হাজারও বিলাসিতার মাধ্যমে বেড়ে উঠে তারা। মুখ ফুটে কিছু না চাইতেই সামনে চলে আসে তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি।

এতক্ষণ আমরা শুনছিলাম ধনী বা সচ্ছল পরিবারের শিশুদের গল্প। এখন যে গল্পটি বলব সেটি একদমই ভিন্ন এক শিশুদের গল্প। আমাদের দেশে এমন হাজার হাজার শিশু আছে যারা জন্ম থেকেই দুঃখী। জন্মের পর যারা মায়ের দুধ ছাড়া আর অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না। মায়ের দুধ কিনতে টাকার প্রয়োজন হয় না এজন্যই হয়তো তাদের কপালে এই মায়ের দুধটুকু জোটে। জন্মের পর চিকিত্সার অভাবে মৃত্যু হচ্ছে হাজার হাজার শিশুর। বিলাসিতা তো দূরের কথা সামান্য পেট ভরার মতো খাবার জোগাতেই হিমশিম সেই মা-বাবা। সুবিধা বঞ্চিত শিশুরা দুনিয়াটাকে চেনার আগেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে হয় খাবারের সন্ধানে। আমরা সাধারণ মানুষ রাস্তাঘাটে, ফুটপাত, রেল স্টেশন, যানবাহন, কারখানার দিকে তাকালেই দেখতে পাই অনেক শিশু হয় ভিক্ষা করছে, না হয় শিশুশ্রম করে পেটের খোরাক মেটাচ্ছে। 

জাতিসংঘের শ্রমবিষয়ক সংস্থা আইএলও এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা বিশ্বে ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রমে জড়িত। এদের প্রায় অর্ধেক বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত। বাংলাদেশে ৫-১৪ বছর বয়সি শিশুশ্রমিকের সংখ্যা মোট শিশু জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ, ছেলে শিশুদের হার ২১.৯ শতাংশ এবং মেয়ে শিশুদের হার ১৬.১ শতাংশ। অর্থনীতির খাত অনুযায়ী শিশুশ্রমিকরা কৃষিতে ৩৫ শতাংশ, শিল্পে ৮ শতাংশ, পরিবহনে ২ শতাংশ, অন্যান্য সেবায় ১০ শতাংশ এবং গার্হস্থ্যকর্মে ১৫ শতাংশ কাজ করে। এক জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো কাজ করেও তারা পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক পায় না। এসব ভারী কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয় অনেক শিশু। ৮ ঘণ্টা শ্রমের বিনিময়ে উপার্জন মাত্র ১০০ টাকা। শহুরে শ্রমজীবী শিশুদের ২৪ ভাগ বিভিন্ন সময় কাজে দুর্ঘটনার শিকার হয়। ২৬ ভাগ শিশু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করে। ১৮ ভাগ শিশু তাদের ছুটিকালীন সময়ে কোনো বেতন পায় না, ১৬ ভাগ শিশু মানসিক নির্যাতনের স্বীকার। তাদের জোর করা, ভয়ভীতি দেখানো, গালাগাল, অপমানজনক কথা বলা হয়। ‘বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের পর এক প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। তাদের কাজের মধ্যে ঝালাই কারখানার কাজ অন্যতম। কারখানা মালিকদের অধিক মুনাফা লাভের আশায় সেখানে নামমাত্র বেতনে শিশুদের দিনরাত খাটানো। কখনো শুধু একবেলা খাবারের বিনিময়ে তাদের কাজে নিয়োজিত করা হয়। কারখানার পরিবেশ দূষণজনিত কারণে শিশুরা শ্বাসকষ্ট, শ্রবণ বৈকল্যসহ নানারকম রোগের শিকার হয়। এছাড়া কারখানা মালিকের নির্যাতন-নিপীড়ন তো রয়েছেই। বাংলাদেশের শিশুশ্রমিকের মধ্যে একটি বিশাল অংশ হচ্ছে মেয়ে শিশু। দরিদ্র পরিবারের বেশির ভাগ মেয়ে শিশুকে গৃহকর্মীর কাজে লাগানো হয়। সেখানে দুই বেলা দুমুঠো খাবারের বিনিময়ে দিনরাত খেটে যেতে হয়। কখনো সামান্য খাবারটুকু থেকেও বঞ্চিত হতে হয় ওদের। এছাড়া নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন তো রয়েছেই। 

কাজ জোগার করে দেওয়ার নামে মেয়ে শিশুদের কায়দা করে ফাঁদে ফেলছে কতিপয় অসাধু মালিক শ্রেণির লোকেরা। অসহায় শিশুগুলো তখন না পারে প্রতিবাদ করতে, না পারে তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলোকে হজম করতে। দারিদ্র আর অসহায়ত্ব এক সময় তাদের এগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত করে ফেলছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আঠারো বছরের কম বয়সি সকল বাংলাদেশি ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে এবং চৌদ্দ থেকে আঠারো বছরের কম বয়সি শিশুদেরকে কিশোর-কিশোরী হিসেবে গণ্য করা হয়। স্কুল চলাকালীন সময় চৌদ্দ বছরের নিচে কোনো শিশুকে তার পরিবারের লিখিত অনুমতি ছাড়া উত্পাদনশীল কাজে নিয়োগ দেওয়া বা কাজ করিয়ে নেওয়াকে শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথবা শিশুশ্রম বলতে শিশুদের শ্রমের সময় প্রত্যক্ষভাবে উত্পাদন কাজে এবং পরোক্ষভাবে গার্হস্থ্য শ্রমে ব্যয় করাকে বোঝায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্যই মূলত শিশুশ্রমের জন্য দায়ী। বাংলাদেশে শিশুশ্রম দিন দিন বেড়ে তা আজ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। প্রতি বছর শিশুশ্রমের ফলে ঝড়ে পড়ছে হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশু। জন্মই যেন তাদের আজন্ম পাপ। সরকারের একার পক্ষে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সমস্যার জন্য দেশের প্রত্যেকেরই সচেতন থাকতে হবে। আমাদের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। মালিক শ্রেণিক শিশুদেরকে দিয়ে কোনো কাজগুলো সম্ভব সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শিশুশ্রম নিরসনে প্রতি জেলায় কর্মকর্তা আছেন, চাইল্ড ওয়েলফেয়ার বোর্ড আছে তাদের কাজের তদারকি করা প্রয়োজন। দরিদ্র পরিবারকে সন্তান গ্রহণের জন্য অবশ্যই তাদের সামর্থ্যের কথা ভেবে একাধিক সন্তান গ্রহণ করা উচিত। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সরকারি বেসরকারি সমাজকল্যাণ সংস্থাগুলো আমাদের বারবার পরিবার পরিকল্পনা করার জন্য সচেতন করছে। সন্তান প্রতিপালনের সামর্থ্য না থাকলে অধিক সন্তান না নেওয়ায় শ্রেয়। এক্ষেত্রে প্রত্যেক বাবা-মায়েদের সচেতন হওয়া জরুরি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়