অবসরপ্রাপ্ত জাঁদরেল কর্মকর্তা টম খানের একমাত্র সঙ্গী প্রিয় কুকুর জিমির গল্প শুনে আবুল তাজ্জব হয়ে যায়! গল্প শুনতে শুনতে আবুলের দুই চোখ বের হয়ে আসতে চায়। মুখ বোয়াল মাছের মতো হা হয়ে যায়। কেমনে সম্ভব! একটা কুত্তা রাজা-বাদশাহদের মতো জীবন কাটায়! মানুষ হইয়া তো সেই জীবন কাটাইতে পারলাম না! হায়! হায়! জিমির মতো কুত্তা হওয়ার সাধ জাগে কি না আবুলের কাছ থেকে জানা যায় না। আবুলকে গল্প শোনায় খাতিরের মানুষ কেয়ারটেকার মফিজ। মফিজ আবুলকে জানায়—তাদের স্যার পুরা বাড়িতে একাই থাকে। বউ মারা গেছে বহুকাল আগে। পোলা-মাইয়া সব বিদেশ। একমাত্র সঙ্গী জিমি। জিমিরে ছাড়া কিছুই বুঝে না। জিমির জন্য আলাদা বাবুর্চি রাখছে। জিমি হাইফাই হোটেলে হাইফাই খাবার খায়। পিজ্জা খায়। বার্গার খায়। হটডগও খায়। কোন দেশে যায় নাই জিমি? আমেরিকা-জার্মানি-ইতালি আরো কত কত দেশ। দামি বিছানায় ঘুমায়। দামি বাথরুমে গোছল করে। দামি জামা-কাপড় পরে। এলাহি কাণ্ড!
আবুলের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মফিজ। মফিজ না থাকলে দোকানদারি করতে পারত না। প্রেম করতে পারত না। পূর্ণিমারে বিয়ে করতে পারত না। আবুল চটপটি-ফুচকা বেচে টম খানের বাসার উল্টো দিকে। আশপাশের মানুষ খুব পছন্দ করে ফুচকা-চটপটি। কোনোদিন ভিড় জমে যায়। দিয়ে শেষ করতে পারে না। বাড়ির সামনে ভিড় জমে যায় বলে খুব বিরক্ত ছিল টম খান। উঠিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তার কেয়ারটেকার মফিজের জন্য পারে নাই। মফিজ কাকুতিমিনতি করে বলেছে, আবুল বাপ-মা হারা গরিব মানুষ। না খেয়ে থাকবে এখান থেকে চলে গেলে। কাস্টমারও চলে যাবে। টম অনুরোধ রাখে। সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিল বলে টানা সাত দিন মফিজকে ফ্রি খাওয়ায়।
অনেক কাস্টমারের মধ্যে পূর্ণিমা নামের এক কাস্টমার খুব প্রশংসা করত। আবুলও প্রশংসা করত তার রূপের। কথায় কথায় জানতে পারে পূর্ণিমা একটা গার্মেন্টসে কাজ করে। বাপ-মা গ্রামে থাকে। আবুল পূর্ণিমার সাথে ভাব জমিয়ে ফেলে। কথায় কথায় জেনে নেয় পূর্ণিমার বিয়েতে অমত নেই। বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ে করার পর বেচাকেনা বেড়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী মিলে ব্যবসা সামলায় আর পাখির মতো শহরে ঘুরে বেড়ায়। সুখের সংসার।
২.
আবুল প্রতিদিনের মতো সিদ্ধ ডিমগুলোর খোসা ছাড়িয়ে এক বাটিতে রাখছিল অন্যমনস্ক হয়ে। গতকালই শুনতে পায় সন্তান আসার দারুণ সুখবরটি। কাজে মন দিতে পারে না। কেবল ভুল হয়ে যায়। জিমি গেট থেকে বের হয়েই আচমকা ডিম রাখা বাটিতে মুখ দেয়। দৃশ্যটি দেখে টম খান রেগে যায়। তার কুকুর থার্ডক্লাস মানুষের পাত্রে মুখ দিয়েছে! রাগ আরো বেড়ে যায় যখন আবুল বলে, কুত্তা কি বুঝে স্যার?
জিমিকে কুত্তা সম্বোধন করেছে! কুত্তা বলেই ক্ষান্ত হয় না আবুল। আবুল আরো বলে, টাকা লাগব না স্যার। দুইটা ডিমেই মুখ দিছে। কয় টাকা আর দাম। টাকা দিয়া লজ্জা দিয়েন না স্যার।
রাগে ভেতরে ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটে। আচমকা তার দোকান তছনছ করে দেয়। কেঁদে কেটে হাতে পায়ে ধরেও রক্ষা করতে পারে না। চোখের সামনে সাজানো বাগান দুমড়ে মুচড়ে যায়।
৩.
কষিয়ে জিমিকে একটা থাপ্পড় মারে। জিমি কুঁইকুঁই করতে করতে চলে যায়। ঘণ্টাখানেক পরে রাগ পানি হয়ে গেলে অনুশোচনায় ভোগে। একমাত্র প্রিয় সঙ্গীকে চড় মেরেছে! জিমিকে খুঁজে পায় না। কোন ফাঁক দিয়ে জিমি বের হয়ে গেছে—মফিজ বলতে পারে না। পুলিশ খবর পেয়ে দৌড়ে আসে। পুলিশ তন্নতন্ন করে খোঁজে। পরিত্যক্ত ফাঁকা ফ্ল্যাটে মরে পড়ে থাকতে দেখে। মাথায় আঘাত। টম খান দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেয়। পুলিশ জানপ্রাণ দিয়ে তদন্তে নেমে পড়ে।
৪.
কে মেরেছে? শোকাগ্রস্ত মনে সন্দেহ জাগে—আবুলের কাজ! টমের নির্দেশে আবুলকে ধরে আনে মফিজ। বারবার আবুল কেঁদে কেঁদে অস্বীকার করে—সে কিছুই জানে না। কোথায় দোকান বসাবে সে চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কুকুর নিয়ে পড়ে থাকার মন-মানসিকতা অবশিষ্ট ছিল না। এই আবেগপূর্ণ কথায় বিশ্বাস করার মানুষ সে নয়। গরিবদের চরিত্র হাড়ে হাড়ে চেনা। বুঝতে পারে কিল-ঘুষিতে কাজ হবে না। আঙুল আরো বাঁকা করতে হবে। যত বাঁকা করবে তত ঘি উঠে আসবে। বেঁধে চাবুক দিয়ে পেটায় তাতেও কাজ হয় না। কী করবে? টম জানে এটা আবুলেরই কাজ। ফকিন্নির বাচ্চায় প্রতিশোধ নিয়েছে! মাথায় রক্ত টগবগ করে। স্বীকার করতেই হবে। কী উপায়ে স্বীকার করাবে? আবুলের বউকে বহুদিন দোকানদারি করতে দেখেছে। মফিজকে অর্ডার করে বউকে নিয়ে আসতে। মফিজের মন সায় দেয় না। থরথর করে কাঁপে। এই কাঁপাকাঁপিতে তার স্যারের মন গলবে না জানে। উল্টো নিজের প্রাণ যেতে পারে। আবুল তো তার বন্ধু! সেদিন উঠিয়ে দিলে এত ঘটনা ঘটত না। মফিজ ঝড়ের গতিতে বের হয়ে যায়। বউকে জানায়, সেদিন দোকান ভেঙে দেওয়ার কারণে স্যার লজ্জিত হয়েছে। মনভরে খাওয়াতে চায়। আবুল আগেই গিয়ে বসে আছে। স্যার সম্মান করে তাকে পাঠিয়েছে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বউ ডাবল খুশিতে নাচতে নাচতে চলে যায়। আবুল বউকে দেখে কাটা গরুর মতো লাফাতে থাকে। বউ আবুলের অবস্থা দেখে বেহুঁশ হয়ে যায়। আবুলের বুকে আঁছড়ে পড়ার আগেই চুল খপ করে ধরে ফেলে। স্বামী-স্ত্রী স্যার স্যার বলতে বলতে ফেনা তোলে। একের পর এক গর্জনে ফেনা ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে জিমি হত্যার স্বীকারোক্তি চায়। খুনের হুমকি দিয়েও কাজ হয় না। অবুঝ বালকের মতো সরল স্বীকারোক্তিতে মন নরম হয় না। সমুদ্রের তলদেশ থেকে সুনামি ওঠে। অনবরত চুল টানাটানি; ঘুরপাক খাওয়াতে খাওয়াতে কষে পেটে লাথি মারে! টম খানের হুঁশ ফিরে! প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। রক্তে আবুলের বউ তলিয়ে যায়। আবুল হার্টফেল করে মারা যায়। টম খান দ্রুত নির্দেশ দেয় লাশ দুটি পুঁতে ফেলতে।
৫.
পুরো এলাকা ওলটপালট করে ফেলে। জিমি হত্যার আসামিকে খুঁজে পায় না। তারা ক্লান্ত। তারা লজ্জিত হয়। লজ্জিত মুখ নিয়ে টম খানের সামনে দাঁড়াতে সাহস পায় না। দাঁড়াতে হবে জানে। দেরি না করে আগে দাঁড়ানোই ভালো। বাসায় গিয়ে পায় না। ভয় পেয়ে যায়। ব্যর্থতার কথা ওপর মহলে জানাল কি না! বদলি হয়ে যাবে! ফোন করেও পায় না। ঘুম হারাম হয়ে যায়। বদলি হওয়ার অর্ডার কখন না এসে পড়ে! কয়েকদিন ঘুরঘুর করেও টম খানের দেখা পায় না। টম খান বাসায় ফেরে। ছেলেমেয়ের কাছে চলে যাওয়ার আগে লাশ দুটো উঠিয়ে অন্য কোথায় ফেলে দিতে হবে। টম খান জানে পাপ একদিন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। আসবেই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। গেটে একজনকে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখে নিচে নেমে আসে।
—কী চাই?
—স্যার, একটা কথা কইতে চাই।
—আমার সাথে কীসের কথা!
—স্যার, আপনার কুত্তাটারে কে মারছে আমি দেখছি।
—কী!
—হ স্যার। ভয়ে এতদিন কই নাই। পলাইয়া আছিলাম। আমি তো কোনো দোষ করি নাই। আমি ভয় পামু কেন? যেই দিন আপনের কুত্তাটা মইরা যায় হেই দিন আমি প্রতিদিনের মতো ঝালমুড়ি বেচতাছিলাম। আপনের কুত্তাটা একা একাই হাঁটতে হাঁটতে একুশ নাম্বার বাড়ির সামনে আইতেই ছাদ থেইকা একটা দশ ইঞ্চি ইটা মাথায় পড়ে। তারপর দেখলাম ওই বাড়ির রাজমিস্তিরি দৌড়াইয়া নিচে আইল। আপনের মরা কুত্তাটা নিয়া লগে লগে দৌড় দিল।
—কী!
