বঙ্গবন্ধুর ধর্মচিন্তা

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২০, ২০:৪০

‘যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ কবি অন্নদাশংকর রায়ের এ দুটি লাইনে শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বাংলার ইতিহাসে জ্বলজ্বল হয়ে থাকবে। শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার  এক ঐতিহ্যবাহী শেখ পরিবারে। তার পিতা শেখ লুত্ফর রহমান ছিলেন ধার্মিক ব্যক্তি। এম আক্তার মুকুল লিখেছেন, টুঙ্গিপাড়ার এই শেখ পরিবারের ঊর্ধ্বতন এক পুরুষ বাগদাদ শরিফ থেকে গোপালগঞ্জের এই এলাকায় ইসলাম প্রচার করতে এসেছিলেন। সুলতানিয়া আমলে আরবিতে ধর্মীয় নেতাদের নামের আগে শায়েখ বা শেখ বলা হয়। ছোট্টবেলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে সবাই খোকা নামে ডাকত। তিনি ধার্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তার চেহারা ও গঠনে আরব দেশের মানুষের আদল প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। তখন থেকেই তার মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ দৃষ্ট হয়। তিনি সাধারণ বালকদের মতন ঘরকুনো ছিলেন না। তাকে সবাই ভালোবাসত। মেধাবী ছাত্র হিসেবে সবাই তাকে জানত। তিনি ছিলেন মানবদরদি। কলকাতায় লেখাপড়ার সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়র্দীর একান্ত সান্নিধ্যে আসেন।

১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটলে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনে প্রচুর অবদান রাখেন এবং তমুদ্দুন মজলিসের সঙ্গে একত্রিত হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। একপর্যায়ে তিনি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একান্ত সহচরে পরিণত হন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে তিনি ইসলামের খেদমতে বহু অবদান রাখেন। ১৯৭১ সালের সাতই মার্চ তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১২ লাখ লোকের সমাবেশে তিনি তার দীর্ঘ ভাষণের একপর্যায়ে বলেন, ‘তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।’ তার এই ইনশাআল্লাহর উচ্চারণের মধ্যেই তার ধার্মিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য ঘটে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ঢাকায় এলেন, তখন ঢাকর রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ লোকের বিশাল সমাবেশে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানিরা আমাকে হত্যা করে আমার কবর দেবার আয়োজন করেছিল। তখন আমি বলেছিলাম, আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান, মুসলমান একবারই মরে। আমার বাংলাদেশে ঘোড় দৌড় থাকবে না। আজ থেকে এখানে মদ খাওয়া নিষিদ্ধ করা হলো।’ তিনি ভুট্টোকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ভুট্টো সাহেব কয় নম্বরে পড়লেন? আমার বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র।’ তিনি বাংলাদেশে ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। তার আগে পৃথিবীর কোনো মুসলিম দেশেই ইসলামের ব্যাপক প্রসারের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রচুর ইসলামি কিতাব প্রকাশিত হয়ে আসছে।

কুরআন, হাদিস, ইসলামের ইতিহাস, মনীষীদের জীবনী, কুরআনের তরজমা-তাফসির ইত্যাদি প্রকাশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মতত্পরতা বিদ্যুত্ বেগে চলছে। বাংলা ভাষায় ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকাশ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন যে অবদান রেখেছে, তা চির অম্লান হয়ে থাকবে। বেশ কিছু গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। মুজিব জন্মশতবর্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অবদান বারবার তার মহত্ কর্মের স্বাক্ষর হয়ে থাকবে। তিনি ঈদে মিলাদুন্নবি উদ্যাপনের গুরুত্ব অনুধাবন করে এটাকে ব্যাপকতা দান করেন। আজো পক্ষকালব্যাপী ঈদে মিলাদুন্নবি রবিউল আউয়াল মাসে পালিত হয়। তার সময় থেকেই ঈদে মিলাদুন্নবি উপলক্ষ্যে সুন্দর স্মরণিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে।

—লেখক :পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরিফ, সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ