যে কোনো বিপদাপদ কিংবা মহামারীই মুসলিম-অমুসলিম-নির্বিশেষে সবার জন্যই শঙ্কার কারণ হলেও উভয়ের শঙ্কা এক ধরনের নয়। অমুসলিমের জন্য মৃত্যু মানে সবকিছু হারিয়ে ফেলা। আর একজন মুমিন মুসলিমের কাছে মৃত্যু মানে সবকিছু হারানো তো নয়ই, বরং তাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি ও চিরকল্যাণকর জান্নাত লাভের প্রশ্ন জড়িত। মুমিনের জীবনে কোনো দুঃখ নেই। মুমিনের জীবন কল্যাণে ভরপুর। এ প্রসঙ্গে নবিজি (স) বলেন, মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর! সবকিছুই তার জন্য কল্যাণকর। আর এই বৈশিষ্ট্য কেবল মুমিনের। তারা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে শুকর আদায় করে। আর অসচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসিবতে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে। প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর। (সহিহ মুসলিম, হাদিস :২৯৯৯)। সুখ-দুঃখ উভয়ই মুমিনের জন্য কল্যাণের, বিষয়টি স্পষ্ট এ থেকেই। অন্যদিকে অমুসলিম কাফেররা যেহেতু মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে আল্লাহর তরফ থেকে কোনো কল্যাণপ্রাপ্ত হবে না, সেহেতু মৃত্যু তাদের জন্য ভয়ের। আল্লাহ বলেন, তারা (কাফেররা) যাদের জন্য আখেরাতে রয়েছে কেবলই জাহান্নামের অগ্নি...।’ (সুরা হুদ, আয়াত :১৬)।
প্রথমত মনে রাখতে হবে, জমিনে যত ধরনের বিপদাপদ ও সংকট-বিপর্যয় দেখা দেয়, তার সবই মানুষের কৃতকর্মের ফল। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তিনি তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা (তাদের কৃতকর্ম থেকে) ফিরে আসে।’ (সুরা রুম, আয়াত : ৪১)। নবিজি (স) বলেন, যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগ রোগের (মহামারীর) প্রাদুর্ভাব ঘটে। তা ছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)।
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (স)-কে প্লেগ রোগ (মহামারী) সম্পর্কে জিগ্যেস করেন। আল্লাহর নবি (স) তাকে জানান, ‘এটি হচ্ছে একধরনের শাস্তি। আল্লাহ যার ওপর তা পাঠাতে ইচ্ছে করেন, পাঠান। কিন্তু আল্লাহ এটিকে মুমিনের জন্য রহমত বানিয়েছেন। অতএব প্লেগ রোগে কোনো বান্দা যদি ধৈর্য ধরে এবং এ বিশ্বাস নিয়ে নিজ শহরে অবস্থান করতে থাকে যে, আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারিত করে রেখেছেন, তা ব্যতীত আর কোনো বিপদ তার ওপর আসবে না, তাহলে সেই বান্দা শহিদের মর্যাদা লাভ করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস :৫৭৩৪)। অতএব, মহামারীতে অতি-আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ও আল্লাহর রহমত কামনার মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা মুমিনের কর্তব্য।
যে কোনো বিপদাপদে বান্দা তার পাপের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা ও শেষ আশ্রয় হিসেবে তারই দিকে ফিরে আসুক, এটাই মহান প্রতিপালকের প্রত্যাশা। পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে বিপদে আল্লাহমুখী হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তাই মহামারী দেখা দিলে মুমিনের প্রধান কাজ হলো নিজের ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে বিনীত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, কিন্তু তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিনয়াবনত হলো না এবং কাতর প্রার্থনাও করল না।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত :৭৬)। বেশির ভাগ মহামারীই সংক্রামক। তাই রাসুলুল্লাহ (স) মহামারীর সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত অঞ্চলে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছেন। মুমিন ইমান ও আন্তরিকতার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করবে। মহানবি (স) বলেন, ‘কোথাও মহামারী দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৫)
আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, (রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য) নবি (স) পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল বারাছি ওয়াল জুনুনি ওয়াল জুযামি ওয়া মিন সাইয়্যিল আছকা-ম’। অর্থ :‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শ্বেত, উন্মাদনা, কুষ্ঠ এবং সব দুরারোগ্য ব্যাধি হতে।’ (আবু দাউদ, হাদিস :১৫৫৪)। হাদিসে আরো এসেছে, যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত দোয়াটি সন্ধ্যায় তিনবার পাঠ করবে, সকাল পর্যন্ত সে কোনো আকস্মাত্ বিপদাক্রান্ত হবে না। আর যে তা সকালে তিনবার পাঠ করবে, সে কোনো আকস্মাত্ বিপদাক্রান্ত হবে না। দোয়াটি হলো, বিসমিল্লা-হিল্লাযি লা-ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা-ফিস সামা-ই, ওয়াহুয়াস সামি-উল আ’লি-ম। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৮৮)
—লেখক :মুহাদ্দিস, সিরাজুল উলুম মহিলা মাদ্রাসা, সাভার
