‘শেখের কিল্লা’ সংরক্ষণ হয়নি ৪৮ বছরেও

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২০, ২১:১০

স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের স্থান নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা

নিলয় মামুন, লক্ষ্মীপুর থেকে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরে ১৯৭২ সালে প্রথম যে গ্রাম থেকে দেশ গঠনের ডাক দিয়েছিলেন, সেটি হলো চর পোড়াগাছা গ্রাম, যেটি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলায় অবস্থিত। সেখানে গিয়ে তিনি নিজ হাতে মাটি কেটে স্বেচ্ছাশ্রমে দুই কিলোমিটার রাস্তা তৈরির কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। এলাকার মানুষের তৈরি মাটির উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ জনতার সামনে তিনি তখন ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই থেকে সাধারণ মানুষের কাছে জায়গাটি পরিচিতি পায় ‘শেখের কিল্লা’ নামে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হলেও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত সেই স্থানে নির্মাণ করা হয়নি কোনো স্মৃতিস্তম্ভ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু যে স্থানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানে ছোটো একটি নামফলক তৈরি করেছে এনজিও সংস্থা ডর্প। ২০১৩ সালে নামফলকটি নির্মাণ করে তারা। তখন থেকে সরকারিভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটিকে সংরক্ষণের জন্য তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হন। বিভিন্ন সময়ে এটি সংরক্ষণের জন্য মানববন্ধন পালনসহ প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও জমা দেন তারা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এই জায়গায় একটি কমপ্লেক্স তৈরি করবে বলে উদ্যোগও নেয়। কিন্তু সেটি পরে আর আলোর মুখ দেখেনি। এদিকে ২০২০ সালে মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে এই এলাকায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্দেশ্যে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ভূমিমন্ত্রী, ভূমিসচিব এই এলাকা পরিদর্শন করেন। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্থানের আশপাশে খাসজমি না থাকায় গুচ্ছগ্রামে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠন করে দেয় মন্ত্রণালয়। সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, গুচ্ছগ্রামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্দেশ্যে তিন একর জায়গা চিহ্নিত করা হয়। সেখানে সুযোগ-সুবিধাসংবলিত বঙ্গবন্ধু স্মারক গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করে সেই গ্রামের প্রবেশপথে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া সুপারিশে প্রকল্পটিতে রাস্তা ও পার্ক  নির্মাণের কথাও বলা হয়।

কিন্তু স্মৃতিস্তম্ভের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। বেশির ভাগ এলাকাবাসীর দাবি, বঙ্গবন্ধু আলেকজান্ডার ও রামগতি সড়কের পাশে যে উঁচু স্থানটিতে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন, সেখানেই স্মৃতিস্তম্ভ বানাতে হবে। তবে সেখানে সরকারি খাসজমি না থাকায় ঐ স্থান থেকে এক কিলোমিটার দূরে গুচ্ছগ্রামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। আবার বঙ্গবন্ধু ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই স্থান চিহ্নিত করা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। 

প্রকৃত স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন

এদিকে সঠিক স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবিতে সম্প্রতি ‘বঙ্গবন্ধু শেখের কিল্লা স্মৃতি ইতিহাস রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে সেখানে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর স্মারকলিপিও প্রদান করা হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক মোহাম্মদ উল্লাহ সওদাগরের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন ডরেপর প্রতিষ্ঠাতা এ এইচ এম  নোমান, রামগতির সাবেক পৌর মেয়র আজাদ উদ্দিন চৌধুরী, রামগতি উপজেলা জাসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন, চর আবদুল্লাহ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা, উপজেলা নাগরিক কমিটির সহসভাপতি সালাহ উদ্দিন ফেরদৌস। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘১৯৭২ সালে আমি দেখেছি, মাটি কেটে স্থানটি উদ্বোধনের পর বঙ্গবন্ধু কোথায় দাঁড়িয়ে বক্তব্য রেখেছেন। সেখানেই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে।’ 

উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বক্তব্য

এ বিষয়ে রামগতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল মোমিন ইত্তেফাককে বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এখানে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করছি নভেম্বরের মধ্যেই সেগুলো বাস্তবায়িত হবে। তিনি বলেন, সড়কের পাশে স্মৃতিস্তম্ভের যে দাবি উঠেছে, সেটি আসলে সম্ভব নয়। কারণ বেশির ভাগ মানুষ সেখানে ইতিমধ্যে ঘরবাড়ি তুলেছেন। সেখানে কোনো খাসজমি নেই। তাই সেটি গুচ্ছগ্রামে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।