কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব বৈশ্বিক সংকটের সৃষ্টি করিয়াছে। ইতিমধ্যে আক্রান্ত হইয়াছে বিশ্বের ১৭৬টি দেশ ও অঞ্চল। বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছে দুনিয়ার অনেক দেশ ও শহর। এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি আর হয় নাই। এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হইয়াছে ২ লক্ষ ৩৭ হাজারেরও বেশি মানুষ, মারা গিয়াছে ১০ হাজারের বেশি। প্রতিদিন বাড়িতেছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শহরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হইতেছে; লকডাউন হইয়া যাইতেছে বিভিন্ন দেশ বা শহর। বাংলাদেশও এই সংকটের বাহিরে নহে। ইতিমধ্যে দেশে ২০ জন আক্রান্ত হইয়াছে, মারা গিয়াছে এক জন। দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি বা ইরানের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে রোগীর সংখ্যা আমাদের মতো কমই ছিল; পরবর্তীকালে ইহা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাইয়া নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। ইতালি সারা দেশ লকডাউন করিয়াও এখনো ইহার লাগাম টানিয়া ধরিতে পারিতেছে না। ফলে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ও তাহা কার্যকর করিবার এখনই সময়। সরকার এরই মধ্যে সকল ধরনের লোকসমাবেশ, জমায়েত, ওয়াজ মাহফিল বন্ধ ঘোষণা করিয়াছে। দেখিতে হইবে ইহা যেন মানিয়া চলা হয়। আরেকটি দুশ্চিন্তার বিষয় হইল, যাহারা ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ আছেন তাহারা ইহার সব বিধিনিষেধ মানিয়া চলিতেছেন না। মূলত আক্রান্ত বাইরের দেশ হইতে আসা প্রবাসীদের ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ থাকার নির্দেশ প্রদান করিয়াছে প্রশাসন। কিন্তু তাহারা পরিবারের সদস্যদের সহিত স্বাভাবিক মিলামেশা বজায় রাখিয়াছেন, অনেকের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনও আসিতেছেন ঘুরিতে। এই অবাধ চলাফেরা পরিবারের সদস্যসহ এলাকাবাসীকে হুমকির মুখে ফেলিতেছে। ইতিমধ্যে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ থাকা ব্যক্তিদের হইতে তাহাদের পরিবারের সদস্যদের আক্রান্ত হইবার ঘটনা ঘটিয়াছে। ফলে এই দিকে কঠোর নজর প্রদান করিতে হইবে, যেন ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ থাকা ব্যক্তিরা বিধিনিষেধ কঠোরভাবে মানিয়া চলেন। প্রয়োজনে তাহাদের বাধ্য করিতে হইবে।
করোনা ভাইরাস নিয়া বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ যুদ্ধাবস্থা ঘোষণা করিয়াছে। ইহা আমাদের জন্যও প্রযোজ্য; এই জরুরি অবস্থায় সবাইকে সাবধানতা অবলম্বন করিয়া চলিতে হইবে। বিশেষ করিয়া আমাদের শহর, গ্রাম ও মফস্সলের অশিক্ষিত, আধাশিক্ষিত মানুষের কী করণীয় সেই বার্তা তাহাদের নিকট পৌঁছাইতে হইবে। সংগত কারণেই মানুষের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্কবোধ কাজ করিতেছে। তবে দেখিতে হইবে ইহা হইতে যেন সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা না দেয়। এই মুহূর্তে আমাদের নেতৃত্বকে সঠিক পথ দেখাইতে হইবে। সামনের দিনগুলিতে কেবল চিকিত্সা খাতের পরীক্ষা হইবে না, একই সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি আর বাজারব্যবস্থাও পরীক্ষার মুখোমুখি হইবে। সরকারকে সকল খাতের বিশেষজ্ঞদের নিয়া সমন্বিতভাবে নীতিনির্ধারণের কাজ করিতে হইবে। বাজারকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখিতে হইবে যেন কোনোরূপ সংকট সৃষ্টি না হয়। এই বিপর্যয়ের কালে জনগণের মধ্যে পারস্পারিক সহমর্মিতা ও ঐক্য সৃষ্টি করিতে হইবে। চীন প্রথম আক্রান্ত হইবার পর আমরা প্রস্তুতি গ্রহণের যথেষ্ট সময় পাইয়াছি, কিন্তু তাহার কতটুকু কাজে লাগাইতে পারিতেছি তাহার উপর আমাদের ভবিষ্যত্ অনেকাংশে নির্ভর করিতেছে।
