ওয়াশিংটনে বসন্ত এসেছে চুপিসারে

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২০, ২১:৩২

আনুশে হোসেন

বসন্তকাল ওয়াশিংটন ডিসিকে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য নান্দনিক মনোরম স্থানে পরিণত করে। প্রতি বছর শহরের চিরাচরিত চেরি ফুলের গাছগুলো—যা আমেরিকানরা জাপানিদের কাছ থেকে পেয়েছিল শান্তির উপহার হিসেবে—ওয়াশিংটনের কয়েকটি বিখ্যাত স্মৃতিসৌধের আশপাশের রাস্তা ও গোলাকার চত্বরগুলো দখল করে নেয়। এ সময় সারা দেশ এবং সারা বিশ্ব থেকে আগত অসংখ্য ভ্রমণপিপাসুর পর্যটন-বাসগুলো জড়ো হয় আমেরিকার রাজধানীটিতে। সৌন্দর্যপিপাসু ভ্রমণকারীরা এ সময় অপেক্ষা করে থাকে—কখন গোলাপি পাপড়ির মেঘে ভরে উঠবে চেরি ফুলের গাছগুলোর শাখাপ্রশাখা! কখন সেসব ফুলে তৈরি গোলাপি চূড়া জেগে উঠবে গাছগুলোর মাথায়। আর গাছগুলো এভাবে গোলাপে রঙের পাপড়ি দিয়ে সব দর্শনীয় স্থান সাজিয়ে তুলবে গোলাপি আভায়।

তবে এই বছর আর গোলাপি রঙের পুষ্পসম্ভারগুলো কাছ থেকে দেখে দৃষ্টিক্ষুধা মেটাবার সুযোগ নেই। অপূর্ব পুষ্পরাজি এবার উপভোগ করার একমাত্র উপায় দূরবর্তী জায়গা থেকে। ওয়াশিংটনের রাস্তাঘাট পর্যটকদের বাস চলাচলের কারণে এখন আর যানজট তৈরি করছে না। ওয়াশিংটন এখন স্তব্ধ। শহরের নাগরিকেরা বাধ্যতামূলকভাবে করোনা ভাইরাসের জন্য কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে, ঘরে বদ্ধ রয়েছে। ফলে, এখন আর দেখতে পারছে না ওয়াশিংটনের চেরি ফুলের গোলাপি আভা কী অপূর্ব সৌন্দর্য বিলোচ্ছে চারদিকটায়, একা একা।

কোভিড-১৯-এর বিশ্বব্যাপী মহামারিটি কেবল ওয়াশিংটন ডিসির মতো বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ধনী দেশের রাজধানী শহরকে বদলে দেয়নি, এর পাশাপাশি এই সংক্রামক রোগের দ্রুত বিস্তার সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে—মহাপ্রতাপশালী আমেরিকাও বিশ্বের আর দশটি দেশের মতোই। যখন করোনা ভাইরাসের করুণার কাছে মাথা নত করার বিষয়টি আসে, তখন আমেরিকাকেও নত হতে হয়। আমেরিকাও তখন অনিরাপদ হয়ে ওঠে।

বলা হচ্ছে, ওয়াশিংটন ডিসি এমন একটি শহর, যেখানে এখনো স্পন্দিত হচ্ছে এবং নিশ্বাস নিচ্ছে ‘রাজনীতি’। এই অস্বাভাবিক সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সময়ে জনগণের ভেতরে গেঁথে বসা শঙ্কা ও ভীতি যে নভেম্বরে আমেরিকার আসন্ন নির্বাচনের ওপর বড়ো ধরনের প্রভাব ফেলবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

যদিও ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের অভিযোগে সিনেটের অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাটি ‘জবাবদিহিহীনতা’র এক নতুন যুগে ঠেলে দিয়েছে আমেরিকার রাজনীতিকে। কিন্তু করোনা ভাইরাস যেন ট্রাম্পের ভাগ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত করার জন্য নতুন করে কঠিন পরীক্ষা নিচ্ছে।

করোনা ভাইরাস গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমেরিকান রাজনৈতিক পটভূমিকে মৌলিকভাবে পরিবর্তিত করেছে। এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, আমেরিকা আর গত মাসের মতো একই দেশ নয় এবং মাত্র কয়েক সপ্তাহের অল্প সময়ের ব্যবধানে আমেরিকান ভোটাররাও নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। চিকিত্সা বিভাগের বিশেষজ্ঞরা যে পূর্বাভাস দিয়েছে, সেই হিসেবে করোনা ভাইরাস সংকট যদি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে দেশের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটা গভীরভাবে আঘাত হানবেই।

ট্রাম্প ও তার নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী যেন এমন এক আলাদা জগতে বাস করেন, যেখানে এসব তথ্যের কোনো গুরুত্ব নেই। দুঃখজনকভাবে, তারা আমেরিকার মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দেওয়া এ-সংক্রান্ত সংবাদকেও ‘ভুয়ো খবর’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। এটি আমেরিকান সংস্কৃতি এবং রাজনীতির এক ধরনের অন্ধকার জগেক নির্দেশ করে—যা মূলত বর্ণবাদী ভাবধারায় ভরপুর। স্পষ্টভাবেই বলা যায়, ট্রাম্পের সমর্থকদের এমন রাজনীতির চেয়ে জাতির জন্য আরো বেশি কিছু করার আছে। যখন ট্রাম্পের সমর্থককুল এক ইরানি জেনারেলকে ড্রোনের মাধ্যমে হত্যা করতে দেখে এবং মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্তে ধরা পড়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের তাদের মায়েদের হাত থেকে কাঁদতে থাকা শিশুদের আলাদা করতে দেখে, তখন তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করতে পিছপা হয় না। প্রকৃতপক্ষে তারা যেই আমেরিকানদের জন্য আমেরিকা চায় সেটা কেবল শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের জন্য।

তবে করোনা ভাইরাসের মতো একটি রোগের গতিবিধি প্রতিকার নির্ভর করে এর প্রতিটি তথ্য-উপাত্তের ওপর। এমনকি এটি আরো বেশি নির্ভরশীল সংক্রমণের সংখ্যার ওপর। এই দুটো ব্যাপারেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বেঠিক হওয়ার জন্য কুখ্যাত। কোভিড-১৯ সংকটটি যেভাবে বিজ্ঞানের গভীরে প্রোথিত হয়ে পড়েছে, সেটির ব্যাপারে নেওয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কার্যালয়ের পদক্ষেপগুলো—যেমন : যে-কোনো ধরনের কর, দেউলিয়াকরণ এমনকি কোনো অভিশংসনের বিচারের ক্ষেত্রগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, ট্রাম্প কতখানি অযোগ্য।

ঘরের ভেতরে কাটানো বদ্ধ একঘেয়ে দিনগুলোতেও ওয়াশিংটনের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে গোলাপি পাপড়ির হাট। আমার চারপাশে ছড়িয়ে পড়া এসব সৌন্দর্য যেন আমাকে প্রলুব্ধ করছে। ডাকছে বাহির পাণে। আমি পেতে চাইছি অমন কোমল পাপড়ির স্পর্শ। কিন্তু আমরা যে সামাজিকভাবে বন্দি! বাড়িতে থাকার জন্য সদাসতর্ক! চারদিকে এখন বিপুল অনিশ্চয়তা। কেবল একটা নিশ্চয়তাই আমাকে আশ্বস্ত করছে। তা হলো—প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত করোনা ভাইরাসের মহামারি মোকাবিলায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক বাস্তবতা চিরকালের জন্য পরিবর্তিত হতে চলেছে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : তাপস কুমার দত্ত

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ