বোরহান বিশ্বাস
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গত ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত সময়কে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করে বিশাল পরিসরে তা উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে মুজিববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোও। বছরব্যাপী মুজিববর্ষ উদযাপিত হবে বিশ্বের ১৯৫টি দেশে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের কাউন্টডাউন (ক্ষণগণনা) শুরু হয় গত ১০ জানুয়ারি থেকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে লোগো উন্মোচন করে দেশব্যাপী ক্ষণগণনার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং বিভিন্ন জনসমাগম স্থলে একযোগে গণনা শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনে সরকার জনগণ, বিশেষত নতুন প্রজন্মের সামনে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মকে তুলে ধরছে।
কিন্তু বিশাল এই কর্মযজ্ঞে একটি সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোধহয় অনেকের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। আর সেটি হচ্ছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলার বন্ধু, অবিসংবাদিত এই নেতার বাংলা জন্ম সাল ও তারিখ। যতদূর জানি, বাংলা ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ৩ চৈত্র বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। আর ঢাকার ধানমন্ডিতে নিহত হন ১৩৮২ বঙ্গাব্দের ২৯ শ্রাবণ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মতারিখ ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মের সঙ্গে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ ও মৃত্যু ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ আগস্টের সঙ্গে ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মতারিখ ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মের সঙ্গে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যেষ্ঠ ও মৃত্যু ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্টের সঙ্গে ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেশ ঘটা করে প্রচার করা হয়। এতে করে ওই ইংরেজি ও বাংলা তারিখগুলো ঢের মনে থাকে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষাতেও এই সংক্রান্ত প্রশ্ন করা হয়। সেই বিবেচনায়, বঙ্গবন্ধুর জন্ম-মৃত্যুর বাংলা সাল ও তারিখ আমরা এবং আমাদের পরের প্রজন্মের ক’জনইবা জানি! পাঠ্যপুস্তকে ও টিভি-বেতারে অনেকটা উপেক্ষিতই থেকে গেছে তাঁর বাংলা জন্ম ও মৃত্যুর তারিখটি।
মুজিববর্ষকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধুর বাংলা জন্মতারিখ জানতে উইকিপিডিয়া ও বাংলা পিডিয়ার দ্বারস্থ হই কিছুদিন আগে। কিন্তু সেখানে শুধু ইংরেজি জন্মতারিখ দেখে বিস্মিত হই। বিশ্বখ্যাত ‘নিউজউইক’ পত্রিকা সেই কবেই বঙ্গবন্ধুকে ‘দ্য পয়েট অব পলিটিক্স’ বা ‘রাজনীতির কবি’ বলে উল্লেখ করেছে! কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতায়ও বঙ্গবন্ধুকে ‘কবি’ সম্বোধন করে লিখেছেন, ‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে/রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন...।’ সুতরাং বিশ্বকবি এবং জাতীয় কবির ক্ষেত্রে যদি ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা জন্ম ও মৃত্যু তারিখটি দেওয়া থাকে, তবে রাজনীতির কবি জাতির জনকের জন্ম ও মৃত্যুর বাংলা তারিখটি আমরা কেন জানব না?
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসসহ সব জাতীয় দিবসে ইংরেজি তারিখের পাশাপাশি বাংলা তারিখ ব্যবহারের পদক্ষেপ নিতে নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না—তা জানতে চেয়ে কিছুদিন আগে রুল জারি করেছেন উচ্চ আদালত। তাই মুজিববর্ষকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে নির্মিত অনুষ্ঠানগুলোতে ইংরেজি তারিখের পাশাপাশি বাংলা জন্মতারিখটিও উল্লেখ থাকলে ভালো লাগত। নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর ইংরেজি জন্মতারিখ ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ মার্চের পাশাপাশি ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ৩ চৈত্রও মনে রাখত। মুজিববর্ষকে সামনে রেখে এমন চাওয়া নিশ্চয়ই অত্যুক্তি নয়। বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।
ঢাকা
