কলেজ গ্র্যাজুয়েশন ও করণীয়

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২০, ২১:৩৩

মো. আবু হানিফ ভূইয়া

গ্র্যাজুয়েট তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ তথা বিশ্বের সর্ববৃহত্ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি । এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে প্রতিবছর প্রায় অর্ধ মিলিয়ন গ্র্যাজুয়েট বের হয়, যা  বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতিবছরে যে সংখ্যক (প্রায় ২ মিলিয়ন) শ্রমজীবী নতুনভাবে প্রবেশ করে তার এক চতুর্থাংশ। গ্র্যাজুয়েশনের তিন বছর পর এই  কলেজ-গ্র্যাজুয়েটধারীদের ৪৬ শতাংশ কর্মহীন, ৩৪ শতাংশ অধিকতর পড়াশোনা বা ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি চাকরির প্রার্থী, ১৯ শতাংশ কর্মজীবী (১৮ শতাংশ বেতনভুক্ত এবং ১ শতাংশ আত্মকর্মজীবী) এবং ১ শতাংশ কোনো কিছুতেই জড়িত হয়নি  অর্থাত্ এক কথায় বলা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ কলেজ গ্র্যাজুয়েটধারী বেকার। বেতনভুক্ত কর্মজীবীদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ শিক্ষা সেক্টরে (৯০ শতাংশ প্রাইমারি ও মাধ্যমিক এবং ১০ শতাংশ টারশিয়ারি লেভেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে), ১৭ শতাংশ ম্যানুফেক্টারিং-এ, ৭ শতাংশ ফিনান্স ও ইনসুরেন্স কর্মকাণ্ডে, ৭ শতাংশ পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে, ৭ শতাংশ  স্বাস্থ্য, নার্সিং এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে, ৫ শতাংশ আইসিটি সেক্টরে এবং ১৪ শতাংশ অন্যান্য সেক্টরে চাকরি করে। কর্মজীবী কলেজ গ্র্যাজুয়েটধারীদের  কেবল এক-চতুর্থাংশ স্ব-স্ব কর্ম নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। অবশ্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটধারীদের কেবল এক তৃতীয়াংশ এসএসসিতে জিপিএ ৪ বা তার ওপরে, সেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং পলিটেকনিক গ্র্যাজুয়েটধারীদের সমমানের এসএসসি জিপিএ যথাক্রমে ৯০ শতাংশ এবং ৭০ শতাংশ। অতএব,  জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ গ্র্যাজুয়েশন আজ প্রশ্নের সম্মুখীন।

কলেজ গ্র্যাজুয়েটধারীদের এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিষ্ঠানের স্ব-অর্থায়নে, সরকারি, বেসরকারি, বৈদেশিক বা আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে ক্লাসে পাঠদান বৈশ্বিক সমসাময়িক করার ক্ষেত্রে স্মার্ট ক্লাশরুম ও মালটিমিডিয়া ক্লাশরুম স্থাপন; স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার লক্ষ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হাজিরা, আর্থিক লেনদেন,  ভর্তি প্রক্রিয়া, পরীক্ষার ফলাফলসহ যাবতীয় অফিসিয়াল কার্যক্রম কাগজে-কলমে নয় অনলাইনভিত্তিক এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেনশন সিস্টেম) চালু; শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিল্প সংযোগ প্রতিষ্ঠা; শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আইসিটি স্কিল, সফট স্কিলস ও আন্তর্জাতিক ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যথাক্রমে আইসিটি ল্যাব, ক্যারিয়ার ল্যাব ল্যাঙ্গুয়েজ এবং ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব প্রতিষ্ঠা; গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা বা মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার স্থাপন, ই-লাইব্রেরি সুবিধা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আর্থিক প্রণোদনা এবং শিক্ষকদের পদোন্নতিতে প্রকাশনা অন্তর্ভুক্তিকরণসহ গবেষণায় যথোপযুক্ত বাজেট প্রণয়ন; শিক্ষকদের গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ট্রেনিংসহ Self Assessment and Quality Assurance (SA and QA) Cell স্থাপন; শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে যত্সামান্য ফি-এর মাধামে আবাসন ও যাতায়াত সুবিধাসহ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বাস্তবায়ন চালু করা যেতে পারে।

এ সমস্ত উন্নয়নমূলক প্রোগ্রাম চালু থাকলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশনের ২৪ মাসের মধ্যে এরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং দেশ উচ্চশিক্ষিত বেকারের ভার থেকে মুক্তি পেয়ে বৈদেশিক র্যামিটেন্স বৃদ্ধিসহ দেশীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে।

সর্বোপরি উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিম্নলিখিত প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি প্রয়োজন বলে মনে করি :

n জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোকে জাতীয়করণ করার পাশাপাশি নৈতিক গুণসম্পন্ন ও মেধাবীদের শিক্ষক পেশায় আকৃষ্ট এবং মর্যাদাবান করার লক্ষ্যে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র ও উন্নততর স্কেল প্রদান।

n যত্রতত্র অর্নাস, মাস্টার্স কোর্স চালু রহিত করে ডিগ্রি (পাস) কোর্সের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। ডিগ্রি (পাস) কোর্সে শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩ বছরের পরিবর্তে ২ বছরের কোর্স চালু করাসহ একটিমাত্র পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ।

n জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কোর্সে নোট-গাইডের ব্যবসা রহিতকরণ।

n ক্লাশে পাঠদান সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষার জন্য জেলা শহরে আলাদা কেন্দ্র স্থাপন এবং পরীক্ষায় নকল মূলোত্পাটনসহ সকল ধরনের প্রহসনমূলক কর্মকাণ্ড রোধকরণ।

n শিক্ষক গ্রুপিং, ছাত্র-শিক্ষক লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি এবং র্যাগিংমুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিতকরণ।

n অত্যাধুনিক বিজ্ঞানাগার স্থাপনসহ নিয়মিত ব্যবহারিক ক্লাস নিশ্চিতকরণ লক্ষ্যে বিজ্ঞান শিক্ষকদের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা চালুকরণ।

কুমিল্লা