গুলশান আরা
হয়তো কিছুই না—হয়তো নিজের অজান্তেই এক মহান কবি লিখলেন এমন একটি নাম, যা ইতিহাসে এক মহান নেতার নাম হিসেবে অমর হয়ে রইল মহাকালের নিরিখে। বলছিলাম কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘রুদ্র-মঙ্গল’ প্রবন্ধ-গ্রন্থের ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধ নিয়ে।
এই প্রবন্ধটি নজরুল আরম্ভ করেছেন এভাবে—‘একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেন: দেখ, যে ন্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটবে কে?
হিন্দু-মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমার বারে বারে গুরুদেবের ঐ কথাটাই মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে, এ-ন্যাজ গজালো কী করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ঐ সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায়—তা ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক—তারাই হয়ে ওঠে পশু।...এই যে ভেতরের ন্যাজ, এর উদ্ভব কোথায়? আমার মনে হয় টিকিতে ও দাড়িতে। টিকিপুর ও দাড়ি-স্তানই বুঝি এর আদি জন্মভূমি।’
....
হিন্দু-মুসলমানের দিনরাত্রির হানাহানি নজরুলকে ব্যথিত করেছে—এ নিয়ে তিনি বহু লেখা লিখেছেন। এই প্রবন্ধের শেষে তিনি বলছেন, ‘মানুষ আজ পশুতে পরিণত হয়েছে, তাদের চিরন্তন আত্মীয়তা ভুলেছে। পশুর ন্যাজ গজিয়েছে ওদের মাথার ওপর, ওদের সারা মুখে। ওরা মারছে লুঙ্গিকে, মারছে নেঙ্গোটিকে; মারছে টিকিকে, দাড়িকে। বাইরের চিহ্ন নিয়ে এই মূর্খদের মারামারির কি অবসান নেই!’ এর পরে নজরুল ইসলাম যা লিখেছেন তা-ই এই নিবন্ধে আমি তুলে ধরার প্রয়াস রাখি। তিনি লিখেছেন, ‘মানুষ কি এমনি অন্ধ হবে যে, সুনীতি বাবু হ’য়ে উঠবেন হিন্দু-সভার সেক্রেটারি এবং মুজিবর রহমান সাহেব হবেন তঞ্জিম তবিলগের প্রেসিডেন্ট? ...’
এই মুজিবর রহমান আমাদের জাতির পিতা মুজিবুর রহমান নন। তবে নজরুল যদি সজ্ঞানে থাকতেন তাহলে আমাদের জাতির পিতা মুজিবকে নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক কথাই বলতেন, যা আজ আর আমরা অনুমান করতে পারছি না।
ঢাকা
