করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) মহামারি নিয়ে সংকট কাটাতে প্রতিদিনই নানা উদ্যোগ ঘোষণা দিচ্ছে বিশ্বনেতৃবৃন্ধ। কিন্তু এতেও আশ্বস্ত হওয়া যাচ্ছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাধারণ জনগণকে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আর্থিক মন্দা প্রতিরোধে এক ট্রিলিয়ন ডলার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে এনেছে ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। অন্যদিকে ৮২০ বিলিয়ন ডলার জরুরি তহবিলের ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় কেন্দ্রী ব্যাংক। যুক্তরাজ্য তাদের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে (শূন্য দশমিক ১ শতাংশ) নামিয়ে এনেছে সুদের হার। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আংশিক জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছে জার্মানি। ৮২ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে কানাডা। শুধু দেশগুলোই নয়, জরুরি তহবিল করেছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রাতহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বিশ্বের বড়ো অর্থনীতির দেশগুলো সুদের হার কমানো, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক প্রণোদানা, ব্যাংক গ্যারান্টির জন্য তহবিল ঘোষণার পরেও অস্থিরতা কাটছে না।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে খুব শিগিগর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব, যা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেবে। বৃহস্পতিবার এক ভিডিও কনফারেন্সে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারি ঠেকাতে দেশগুলো যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না হয়তো। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই অবস্থায় বিশ্বনেতাদের সমন্বয় করে, মাথা ঠান্ডা রেখে আরো উদ্ভাবনীমূলক কর্মপন্থায় কাজ করতে হবে। গুতেরেস বলেন, ‘আমরা একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। স্বাভাবিক নিয়মে এর থেকে বের হওয়া যাবে না। বিশ্ব এখন অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।’ ব্যাংকগুলোকে তাদের গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করার কথাও বলেন তিনি। কোনো ধনী দেশ যেন এটা মনে না করে যে কেবল তার দেশের নাগরিকদের সমস্যা মিটলেই সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। বরং নিজেদের স্বার্থেই তাদের উচিত অন্য দেশগুলোকে সহায়তা করা। কেননা, যে কোনো সময় যে কোনো দিক থেকে সংকটের উদ্ভব হতে পারে। তিনি বলেন, জি-২০-এর নেতারা তাদের নাগরিকদের ও অর্থনীতির সুরক্ষায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। তারা সাধারণ জনগণের ঋণে সুদের হার কমিয়ে দিয়েছেন। আমাদের উচিত নাজুক দেশগুলোর প্রতিও একই পন্থা অবলম্বন করা, যাতে তাদের ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমে।
বিশ্লেষকেরা বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ায় আমেরিকা ও ইউরোপ জুড়ে রেস্তোরাঁ, দোকানপাট, বিমান চলাচল ও কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্বমন্দা আর আশঙ্কা নয়, বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়াতেও। তবে বিশ্বনেতৃবৃন্দ একটার পর একটা উদ্যোগের কথা জানালেও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এমন পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অন্তত আড়াই কোটি মানুষ কর্মহীন হতে পারে। সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ স্টিগলিজ বলেছেন, ভবিষ্যত্ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার প্রতিফলন হয় শেয়ারবাজারে। মহামন্দার সময়েও শেয়ারবাজারে এর প্রতিফলন হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ কাজ করতে যেতে পারছে না, ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে। বর্তমান পুঁজিবাজার বাস্তবতাকেই প্রতিফলন করছে। সাবেক বিল ক্লিনটন সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে সরকার গঠন হওয়ার পর বড়ো করছাড় দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এতে অনেক উচ্ছ্বসিত ছিলেন, কিন্তু তাদের দৃষ্টি ছিল স্বল্পমেয়াদি। তাই মহামারির মতো বড়ো ধরনের সংকটে তারা শেয়ারবাজার থেকে পুঁজি সরিয়ে ফেলছেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মহামারি ছড়িয়ে পড়ায় যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, সেটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে। আইএলওর মহাপরিচালক গাই রাইডার বলেন, এটি কেবল বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংকট নয়; একই সঙ্গে এটি অর্থনৈতিক সংকট, যার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের ওপর প্রভাপ পড়বে। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে বিশ্ব একযোগে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কাজ করেছিল, যার ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল। এবারের সংকট মোকাবিলায় একই রকম নেতৃত্ব প্রয়োজন।
কানাডায় ৮২ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল কানাডা থেকে জানান, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো করোনা সংকট মোকাবিলায় জনগণের জন্য গতকাল আরো ৮২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিলেন। গত সপ্তাহে ১ বিলিয়ন ব্যয়ের ঘোষণা থাকলেও এবার তা বেড়ে দাঁড়াল ৮২ বিলিয়নে। গতকাল রাজধানী অটোয়ায় তার বাসভবন রিডো হাউজ থেকে তিনি বলেন, ‘কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে আমরা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আবারও ঘোষণা করলাম। ঘোষিত এই অর্থের মধ্যে চাইল্ড বেনিফিট প্রদানের ক্ষেত্রে অস্থায়ীভাবে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত সহায়তা সরবরাহ করা হবে। শ্রমিকদের সহায়তা প্রদানের জন্য ১৫ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিপাক্ষিকভাবে ৯০০ ডলার পর্যন্ত একটি নতুন জরুরি কেয়ার বেনিফিট দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঋণ পরিশোধের জন্য ছয় মাসের সুদমুক্ত ঋণ, গৃহহীন কেয়ার কর্মসূচি দ্বিগুণ করা, ট্যাক্স ফাইলিংয়ের সময়সীমা ১ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধিকরণ, আদিবাসীদের তাত্ক্ষণিক নানাবিধ প্রয়োজনের জন্য ৩০৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠন ইত্যাদি রয়েছে।
