সাভার উপজেলার একমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মোফাজ্জল-মোমেনা চাকলাদার মহিলা কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১৯৯২ সালে ‘সাভার মহিলা কলেজ’ নামে কলেজটি আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর এর নামকরণ ‘সাভার মোফাজ্জল-মোমেনা চাকলাদার মহিলা কলেজ’ করা হয়। শুরুতে কলেজটি এইচএসসি পর্যন্ত থাকলেও বর্তমানে তা ডিগ্রি কলেজে উন্নিত হয়েছে। ২০০৪ সালে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়।
জানা গেছে, ২০২০ সালের আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার জন্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনী পরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী ২/৩ বিষয়ে ফেল করেছে তাদের কাছ থেকে রশিদ ছাড়াই টাকা আদায় করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে টাকার বিনিময়ে ফেল করা অধিকাংশ ছাত্রীকে নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দেখিয়ে ফরম ফিলাপের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ব্যবহারিক পরীক্ষার নাম করে এ কলেজে বিনা রশিদে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ঘটনা নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি সূত্র জানায়, যেসব শিক্ষক ২০-২২ বছর যাবত্ এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন তাদের ডিঙ্গিয়ে কলেজের সর্বকনিষ্ঠ এক শিক্ষিকাকে ভারপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, ঐ শিক্ষিকার এমপিওভুক্তির বয়স মাত্র চার-পাঁচ বছর। এ নিয়ে কলেজের সিনিয়র শিক্ষকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রায় চার বছর যাবত্ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে চলছে কলেজটির কার্যক্রম। অধ্যক্ষ না থাকায় কলেজটির স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য ২০১৭ সালে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল কলেজ কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর নির্দিষ্ট তারিখে যথারীতি নিয়োগ পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষে ফলাফলের ভিত্তিতে তিন জন প্রার্থীকে নিয়ে অধ্যক্ষ প্যানেল তৈরি করা হয়। পরীক্ষায় যিনি প্রথম হন তাকে এক মাসের মধ্যে কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের জন্য চিঠি দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তিনি বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অজ্ঞাত কারণে কলেজে যোগদান করেননি। ফলশ্রুতিতে নিয়ম অনুযায়ী প্রথম জন যোগদান না করলে প্যানেলের দ্বিতীয় জন অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগের জন্য বিবেচিত হবেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে অধ্যক্ষ প্যানেলের দ্বিতীয় জনকেও গভর্নিং বডি নিয়োগ দেয়নি। ফলে দীর্ঘদিন যাবত্ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়েই চলছে কলেজটির কার্যক্রম। এতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত কলেজ গভর্নিং বডির সভা অনুষ্ঠিত হয় না। কিন্তু কাগজে-কলমে তা দেখানো হয়। এমনকি সরকার কর্তৃক উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বেতন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে পরীক্ষার আগে বাধ্যতামূলক বিশেষ ক্লাস করানোর কথা বলে ফর্ম ফিলাপের সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে রশিদ ছাড়াই জনপ্রতি অতিরিক্ত ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি হালাল করার জন্য নিজেরাই ‘টাকা আদায়ের বহি’ এর ফরমেট তৈরি করে ঐ বইতে শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর গ্রহণের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে।
শিক্ষা বোর্ডের কোনো নির্দেশ না থাকলেও একই কায়দায় ব্যবহারিক পরীক্ষার সময় ছাত্রীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বিনা রশিদে আদায় করা হয়ে থাকে, যা অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে দেওয়া কষ্টকর। কিন্তু ব্যবহারিক পরীক্ষায় নাম্বার কম দেওয়ার ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ঐ টাকা আদায় করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী জানায়, এ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তার সনদপত্র আনতে গেলে ইচ্ছাকৃতভাবে কলেজ কর্তৃপক্ষ কালক্ষেপণ করে। সনদ চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কতিপয় শিক্ষক এ কলেজেই পড়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। এক পর্যায়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ ঐ শিক্ষার্থীর অনুমতি ব্যতিরেকেই তার সনদ ব্যবহার করে তাকে ডিগ্রিতে ভর্তি করিয়ে রাখে। ফলে সে অন্য কোথাও ভর্তি হতে চাইলেও তা পারে না। এ ব্যাপারে গভর্নিং বডির সদস্য মাসুদ চৌধুরী কলেজটি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে চলছে স্বীকার করলেও অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে তার জানা নেই বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। কেউ যদি দুর্নীতি কিংবা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোরশেদা বেগম বলেন, অধ্যক্ষ নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণ কলেজের গভর্নিং বডির এখতিয়ার। গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তেই আমি অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছি।
