বিশ্বে বর্তমানে ৩৫০ কোটি মানুষ স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন। বাংলাদেশে এই ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় পৌনে ৩ কোটি। স্মার্ট ফোন কিংবা ট্যাব-ফ্যাব এখন শিশুদের হাতেও শোভা পাইতেছে। বিশেষ করিয়া আধুনিক বাবা-মায়েরা যেমন স্মার্ট ফোনের স্ক্রিনের প্রতি ডুবিয়া থাকেন অহর্নিশ, তেমনি শিশুরা যাহাতে তাহাদের বিরক্ত না করে সেই জন্য শিশুটির হাতেও একটি স্মার্ট ডিভাইস ধরাইয়া দেওয়া হয়। ধরা যাক, এই ক্ষেত্রে শিশুটির অভিভাবক ইন্টারনেট ব্যবহারে চ্যাইল্ড লক চালু করিবার ব্যাপারে সচেতন; কিন্তু তাহার পরও আরো কিছু ভয়ংকর ক্ষতির দিক কিন্তু রহিয়াই যায়। সত্যিকার অর্থে মোবাইল ফোনের দুইটি ক্ষতিকর দিক লইয়া বিশ্বের সচেতন মানুষ ক্রমশ উদ্বিগ্ন হইতেছেন। এই দুইটি দিকের একটি হইল মানসিক ক্ষতি, অপরটি শারীরিক। মোবাইল ফোন-সৃষ্ট ক্ষতিকর বস্তুটির নাম ‘রেডিয়েশন’ বা বিকিরণ। এক মোবাইল হইতে অন্য মোবাইলে এই বিকিরণশক্তির মাধ্যমেই কথা আদান-প্রদান হয়। এক গবেষণায় দেখা গিয়াছে, ১৯৭৫ সালের পূর্বে হার্ট অ্যাটাক ও ব্রেন ক্যানসারের রোগী তুলনামূলক কম ছিল। পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাইবার কারণে এই ভয়ংকর রোগ দুইটির মাত্রা বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়া মনে করেন অনেক গবেষক।
তবে মোবাইল ফোনের যে ক্ষতিটি এখন উদ্বেগের পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে, তাহা লইয়া এই ডিভাইসের প্রতি শিশুদের প্রবল আসক্তি। বিকিরণ সমস্যার কথা না হয় উহ্যই রহিল, দেখা যাইতেছে মোবাইল ফোন ছাড়া একটি শিশু তিন বেলা ঠিকমতো খাইতে পারে না। তাহার খেলাধুলা, বিনোদনের জগত্ বন্দি হইয়া পড়িয়াছে পাঁচ বা ১০ ইঞ্চির ডিজিটাল পর্দায়। ইহা যে কতটা ভয়ংকর এবং দিনকে দিন ইহা এমনই ভয়াবহ সমস্যার দিকে ধাবিত হইতেছে যে, একটি শিশুর পুরো মানসিক জগত্ ওলটপালট করিয়া দিতেছে। কে না জানে, শিশুরা নরম মাটির মতো। তাহাদের যেইভাবে তৈরি করা যাইবে, তাহারা সেইভাবেই গড়িয়া উঠিবে। মোবাইল ফোনের ডিজিটাল দুনিয়ায় যে অদ্ভুত ফ্যান্টাসি রহিয়াছে, শিশুটি সেই জগতে বুঁদ হইয়া পড়ে। আটকাইয়া পড়ে মিথ্যা মায়াবি বিস্ময়জগতে। ফলে বাস্তব দুনিয়ার সহিত তাহাদের মিথস্ক্রিয়ার ঘাটতি বাড়িতে থাকে। ইহার পরিণতি হইতে পারে ভয়াবহ। একপর্যায়ে শিশুরা সারাক্ষণ ফোন লইয়া থাকিতেই আনন্দ বোধ করিবে। কাহারো সহিত কথা পর্যন্ত বলিতে আগ্রহী হইবে না। এমতাবস্থায় ফোন কাড়িয়া লইলে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিবে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়াইয়া পড়িবার কারণে গৃহবন্দি হইবার বাধ্যতামূলক পরিস্থিতি তৈরি হইতেছে। বাংলাদেশেও এখন লকডাউনের কাছাকাছি অবস্থা। এমতাবস্থায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া অবধি শিশুরা যেন তাহাদের বাবা-মায়ের সহিত গৃহকোণে সময় কাটাইতে আরো বেশি স্মার্ট ফোনের দিকে ঝুঁকিতে না পারে। বাড়িতে এই দীর্ঘ লকডাউনের সময় স্মার্ট ফোন ব্যতীত শিশুসন্তানের সহিত কী করিয়া গঠনমূলক সময় কাটানো যায়, তাহা লইয়া প্রত্যেক অভিভাবককে ভাবিয়া দেখিতে হইবে।
