অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার
এক ভদ্রলোক তার দোতলার ব্যালকনিতে বসে আছেন। তার স্ত্রী ঠিক তার পেছনে কিছুটা দূরে বসে হাতে সোয়েটার বুনছেন। ভদ্রলোক নিচের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর পর পেছন দিকে মাথা সরিয়ে নিচ্ছেন এমনভাবে, যেন কোনো বস্তুর আঘাত থেকে তিনি তার মুখমণ্ডল রক্ষা করতে সচেষ্ট। বিষয়টি কিছুক্ষণ দেখার পর ভদ্রলোকের স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কিছুক্ষণ পরপর মাথা সরিয়ে নিচ্ছ কেন?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘নিচতলায় বাড়ির সামনে লেপ সেলাই করছে। লেপ সেলাইয়ের কারিগর যখন লেপে সুঁইয়ের ফোঁড় দিয়ে সুঁইসহ হাত ওপরে তুলছে, ঠিক তখনই আমি মুখ সরিয়ে নিচ্ছি এই ভেবে যে সুঁইয়ের খোঁচা যেন আমার মুখে না লাগে।’ ভদ্রলোকের স্ত্রী উত্তর শুনে কপট রাগ নিয়ে বললেন, ‘লেপ সেলাই করছে নিচতলায় আর তুমি মুখ সরাচ্ছ দোতলা থেকে। এটা কোন ধরনের সতর্কতা!’ ভদ্রলোক মুচকি হেসে স্ত্রীকে বললেন, ‘সাবধানের মার নেই।’ হ্যাঁ, ঠিক তাই। গল্পের সুঁই বাতাসে ভেসে এসে হয়তো ভদ্রলোকের চোখে লাগত না, তাই বিষয়টি স্ত্রীর কাছে ছিল অমূলক সতর্কতা। কিন্তু করোনা ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমেই একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে সংক্রমিত হয়। সে ক্ষেত্রে অতি সাবধান হওয়া বাঞ্ছনীয়।
করোনা এখন আমাদের একক সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে আমাদের আতঙ্কিত না হয়ে সাবধান হতে হবে। তবে সাবধানতার মানদণ্ড হতে হবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে স্বীকৃত। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা ভাইরাস বাতাসে ভাসতে পারে ৩০ মিনিট আর যাতায়াত করতে পারে ১৪ ফুট। গবেষকেরা জানতে পেরেছেন, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে নির্গত হওয়ার পর ভাইরাসটি কোনো কঠিন তলে কয়েক দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। স্পর্শের মাধ্যমে অন্যের শরীরে চলে যেতে পারে। তাছাড়া কেউ সেই তলে অবচেতন মনে হাত রাখার পর নিজের নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করলে তারও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ভাইরাসটি কতক্ষণ সক্রিয় থাকবে, তা নির্ভর করছে তলের ধরন ও তাপমাত্রার ওপর। প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভাইরাসটি কাচ, কাপড়, ধাতু, প্লাস্টিক ও কাগজের ওপর দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।
ইতিপূর্বে আক্রান্ত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে সরকার সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমাদের উচিত সরকারকে সহায়তা করা। বিনা পয়সার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আতঙ্ক ছড়ানোর কাজ না করা। ১৮/৩/২০২০ ইং একটি জাতীয় দৈনিকের খবর, ‘করোনা নিয়ে ফেসবুকে গুজব, র্যাবের হাতে আটক এক’। ভুয়া খবর ছড়িয়ে সরকারকে বিপাকে ফেলা এবং জনগণকে আতঙ্কের মধ্যে রাখা কোনো সুনাগরিকের কাজ হতে পারে না। আমাদের উচিত করোনার প্রতিরোধমূলক সব পন্থা প্রয়োগের জন্য সচেষ্ট থাকা এবং অন্যকে সাবধান থাকতে বলা। অবাধ তথ্যপ্রাপ্তির যুগে আমাদেরই বেছে নিতে হবে কোনটি সঠিক তথ্য। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার জন্য আমাদের বেশ কিছু নিয়মকানুন সাবধানতার সঙ্গে মেনে চলতে হবে।
ফেস মাস্কে করোনা প্রতিরোধ করা যায়। গবেষকেরা বলেছেন, জনাকীর্ণ স্থানে অবশ্যই মাস্ক পরে থাকতে হবে। বারবার হাত ধোয়া এবং হাত নাকে-মুখে-চোখে না লাগানোই করোনা ভাইরাসের উত্তম প্রতিরোধ। হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে সাবান-পানি সবচেয়ে কার্যকর। করোনা ভাইরাসের বাইরের আবরণটি চর্বির। কাজেই ক্ষারযুক্ত যেকোনো সাধারণ সাবান এক্ষেত্রে কার্যকর। কারণ ক্ষারে চর্বির আবরণটি ভেঙে যায়, হাত ভাইরাসমুক্ত হয়। সাবান-পানি না থাকলে অ্যান্টিসেপটিক হ্যান্ডওয়াশ বা অ্যালকোহলযুক্ত স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে পারেন।
বিশ্বখ্যাত হূদেরাগ বিশেষজ্ঞ ডা. দেবী শেঠীর মতে, করোনা ভাইরাসের অন্যতম একটি উপসর্গ হচ্ছে জ্বর। কিন্তু জ্বর হলেই করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার মতে, অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভবিষ্যতে বিপদ বাড়াবে। ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব চালালেও এখনো এর নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে করোনা চিকিত্সায় সবচেয়ে সফল দেশ চীনের ন্যাশনাল হেলথ কমিশন ইতিমধ্যে করোনা প্রতিরোধে কার্যকর ৩০টি ওষুধের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে কিউবার ইন্টারফেরন আলফা টু-বি (Interferon alpha 2-b) নামের একটি ইনজেকশন। কিউবার প্রায় দেড় হাজার রোগী সুস্থ হয়েছেন এই ইনজেকশনে। এরপরই রয়েছে জাপানের ফেভিপিরাভির (Favipiravir) নামে ইনফ্লুয়েঞ্জার ট্যাবলেট, মাত্র চার দিন সেবনেই দূর হয় করোনা। গত ১৮/০৩/২০২০ ইং তারিখে জাপানি সংবাদমাধ্যম বিষয়টি জনসমক্ষ্যে আনে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানও এ বিষয়ে বিশেষ প্রতিবেদন করেছে। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে।
লেখক : কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
