ডিজিটাল বাংলাদেশে ইবর্জ্য ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২০, ২১:৫০

মাহমুদ কামাল এনামুল হক

ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রযুক্তির বিকাশ চোখে পড়ার মতো। আর সেই প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। দৈনন্দিন জীবনের একটি দিনও আমরা ইলেকট্রনিক পণ্য ছাড়া চলতে পারি না। অন্যদিকে ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনিভাবেই বেড়ে চলেছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য। বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, যা তাদের ব্যবহারকারীর কাছে মূল্যহীন হয়ে যায় বা তাদের মূল উদ্দেশ্য আর পূরণ করে না, তাকে ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ইবর্জ্য বলা হয়ে থাকে। ইলেকট্রনিক পণ্যগুলোর বাড়তি অংশ প্রতিস্থাপন বা ভাঙনের মাধ্যমে তাদের কার্যকারিতার মানটি শেষ হয়ে যায়, সেই সব বর্জ্যপণ্যের মধ্যে রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন,  মাইক্রোওভেন ও ‘ব্রাউন পণ্য’ যেমন টেলিভিশন, রেডিও, কম্পিউটার ও সেলফোন উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানে ইবর্জ্যকে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমান বর্জ্যপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যাপী ইবর্জ্য সমস্ত পৌর কঠিন বর্জ্যের ৫ শতাংশেরও বেশি উত্পাদন করে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইবর্জ্যের উত্পাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইবর্জ্য উত্পাদনের হার দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যথেষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যক্রম নেই। আমাদের দেশেও ডিজিটাল জিনিসপত্র ও পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন ইলেকট্রনিক পণ্য কেবল আমদানিই করছে না, উত্পাদনও  করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফলে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যবহার যে পরিমাণে বেড়েছে, তা গত ৩০ বছরের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, দেশে প্রতি বছর ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন ইলেকট্রনিকস ওয়েস্ট বা ইবর্জ্য তৈরি হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ইবর্জ্য উত্পাদনের হার আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ইবর্জ্য প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য বহু ক্ষতিকর উপাদান ধারণ করে, যার মধ্যে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, বেরিলিয়াম, লেড অক্সাইড প্রভৃতি ধাতব ও রাসায়নিক উপাদান উল্লেখযোগ্য। এসব ধাতব ও রাসায়নিক উপাদান ধুলোমাটি বা পানির মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। তাছাড়া ভেজা ও শুকনো জমির মধ্য দিয়ে মিশ্রণগুলো মাটিতে প্রবেশ করতে পারে এবং মাটি ও পানি উভয়ে দূষণের কারণ হতে পারে। সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, এবং পলিক্লোরিনেটেড বাইফোনিলসজাতীয় (পিসিবি) পদার্থগুলো ল্যান্ডফিলগুলোতে জমা হলে মাটি বিষাক্ত হয়ে যায়। ইবর্জ্যের মধ্যে অনেক বিষাক্ত পদার্থ ও রাসায়নিক যৌগ আছে, যা রোদে ও তাপে নানাভাবে বিক্রিয়া করে। এ থেকে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশদূষণ। এই বিপদ থেকে বাঁচার উপায় হলো ইবর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার। ইবর্জ্য পুনর্ব্যবহারে নিরাপদ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না হলে শুধু পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, অর্থনৈতিক ও ব্যাবসায়িক দিক থেকেও ক্ষতি হচ্ছে।

ইবর্জ্যের ব্যবস্থাপনার সর্বোত্তম উপায় হলো এটি সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা। ইবর্জ্যে অনেকগুলো পৃথক উপাদান রয়েছে এবং উপাদানগুলো যেন নতুন পণ্যে রূপান্তরিত হতে পারে তার দিকে লক্ষ রাখতে হবে। ভেঙে ফেলা ও টুকরো টুকরো করা পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিষ্কাশনের জন্য বিশেষ সরঞ্জাম প্রয়োজন, যা দূষণ রোধ, কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারবে। সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে সম্পাদন করতে হবে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান নতুন পণ্য তৈরি করতে ব্যবহার করা যায়। পুনর্ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পৃথিবী থেকে সীমিত কাঁচামাল খনির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে। শুধু খনির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস নয়, দূষণও হ্রাস করে। কারণ খনির প্রক্রিয়াটি থেকে কাঁচামাল কমতে থাকলে তা আমাদের পরিবেশে প্রভাব ফেলে। ইবর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা আমাদের পৃথিবীর মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে সহায়তা করে। তাছাড়া ইবর্জ্য পরিশোধন করে কপার বা স্বর্ণের মতো মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কয়েকটি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে, কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ইবর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে না। ইলেকট্রনিকস পণ্য আজ আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, তবে এর সঙ্গে আসা ইবর্জ্য পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং, আমাদের ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করার আগে সঠিক ব্যবস্থাপনা করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এটি না করার পরিণতি বেদনাদায়ক হতে পারে। তাই  বাংলাদেশে এসব পুরোনো ইলেকট্রনিকস পণ্য ও ইবর্জ্যের নিষ্পত্তি বা পুনর্ব্যবহারের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা অবকাঠামো তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে। সেই সঙ্গে সর্বস্তরে সচেতনতা ইবর্জ্যের ব্যবস্থাপনা সহজ করতে পারে। 

n লেখক :শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স

অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি

কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়