সিরিয়া-সংকট এবং বর্তমান অবস্থা

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২০, ২১:৫০

মো. বিপ্লব আলী

যে দেশটি সভ্যতার চারণভূমি ছিল একসময়, সে দেশটি আজ যুদ্ধবিগ্রহ, ধ্বংস, মৃত্যু এবং প্রতিনিয়ত জমাটবাঁধা রক্তের স্তূপে পরিণত হয়েছে। সে দেশটি হলো সিরিয়া। প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলার ফলে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা বিশাল সংকটে পড়েছে, যার কারণে সিরিয়ার মানুষ নোংরা, দুর্গন্ধ এবং পচা ডাস্টবিনের খাবার খেয়ে কেউ কেউ জীবন কাটাচ্ছে। সিরিয়া যুদ্ধের সূত্রপাত হয় ২০১১ সালে আরব বসন্তে। এ সময় মধ্যপ্রাচ্য মিশর, ইয়েমেন, লিবিয়া, তিউনিসিয়া লেবানন, বাহরাইন এবং সিরিয়াতে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এর ফলে মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মদ আল-গাদ্দাফি এবং তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জেন এল আবেদিন বেন আলির পতন হয়। এদিকে সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীসমূহ ইসলামিক স্টেট, আল-কায়দা, কুর্দি এবং আসাদবিরোধী সুন্নি সম্প্রদায় সিরিয়ার বেশির ভাগ জায়গা দখল করে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করেন। অন্যদিকে আমেরিকা সিরিয়ার সরকারবিরোধীদের অস্ত্র ও আর্থিকভাবে সমর্থন দিলে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশ্বের অন্যতম পশ্চিমাবিরোধী রাষ্ট্র রাশিয়া এবং ইরান সিরিয়ার সরকারকে সমর্থন করে। রাশিয়া প্রত্যক্ষ এবং ইরান পরোক্ষভাবে সিরিয়াতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের মোকাবিলা করতে সক্ষম হচ্ছে। প্রায় ১০ বছরের গৃহযুদ্ধে আসাদ সরকার সিরিয়ার অধিক অংশ ভূমি বিদ্রোহীদের নিকট থেকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলেও এখন পর্যন্ত ইদলিব প্রদেশ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ আছে। সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশ হচ্ছে এখন বাশার আল-আসাদবিরোধীদের সর্বশেষ ঘাঁটি, এই শহরে ২৬ লাখ মানুষের বসবাস, যেখানে বিদ্রোহীদের মধ্যে আল-কায়দা সমর্থক জিহাদি গোষ্ঠী এবং তুরস্ক সমর্থক বিদ্রোহী জিহাদি বাহিনীর শক্ত অবস্থান। এখন প্রশ্ন হলো, তুরস্ক সিরিয়া বিষয়ে এত বেশি জড়িয়ে পড়েছে কেন? মূলত তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বাশার আল-আসাদের কট্টর বিরোধী। এছাড়া সিরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘ সীমান্ত আছে, যার ফলে সিরিয়া থেকে পালানো মানুষ তুরস্ককে তাদের স্বাভাবিক গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। আর একটি গভীর কারণ সিরিয়ার যে কুর্দি জনগোষ্ঠী আছে, তারা যেন বাশার আল-আসাদবিরোধী বিদ্রোহের সুযোগে তুরস্ক সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে সে চেষ্টা করে চলেছে তুরস্ক। এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া সমর্থিত বাশার আল-আসাদ বাহিনী সিরিয়ায় অবস্থিত তুর্কি সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করলে তুরস্ক পালটা হামলা চালায়। এই হামলায় তুর্কি প্রায় ৫০ জন সৈন্য নিহত হয়। যার ফলে তুরস্ক এবং রাশিয়া গত ৫ মার্চ যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত করে। সিরিয়ার সংকটে প্রাণ দিয়েছেন ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৯০০ মানুষ। যার মধ্যে ১ লাখ ৬ হাজার বেসামরিক নাগরিক। তথ্যসূত্র যুক্তরাজ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা দি সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস। সিরিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। এই প্রশ্নে বিবিসির বিশ্লেষক জোনাথন মার্কস বলছেন, আফগানিস্তান এবং ইরাকে সামরিক হস্তক্ষেপ করার সময় পশ্চিমা শক্তিগুলোর পরিষ্কার কোনো লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু রাশিয়া জানে কেন তারা সিরিয়ায় গেছে এবং সেই উদ্দেশ্য থেকে তারা এক পাও পিছু হটেনি এবং যে কোনো মূল্যেই তারা সেই উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রায় দর্শকের মতো হয়ে পড়েছে, কারণ রাশিয়া ছাড়া এখানে উত্তেজনা কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করার মতো কেউ নেই। তিনি বলছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি ব্যর্থতা বোঝায় যায় এখন সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশ থেকে বিদ্রোহীদের প্রতিহত করা সময়ের ব্যাপার, আর ইদলিব প্রদেশ থেকে বিদ্রোহীরা পরাজিত হলে সিরিয়ায় নতুন করে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করবে যা বিশ্ব শান্তিকামী মানুষদের প্রত্যাশা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়