শুরু হইয়াছিল গত বত্সর ডিসেম্বর মাসে। সারা বিশ্ব করুণার চোখে চাহিয়া ছিল চীনের উহানের দিকে। আহা! কী ভয়াবহ দুর্যোগ! গত বত্সর শুরু হইয়াছিল বলিয়া দুর্যোগের নাম হয় ‘কোভিড-১৯’। অতঃপর মাত্র চার মাসের ব্যবধানে উহা ছড়াইয়া পড়ে বিশ্বের ১৮৩টি দেশে। এখন হঠাত্ই যেন নূতন ক্লাইমেক্স শুরু হইয়াছে। চীনের প্রতি অনুকম্পা উলটাইয়া গিয়া চীনই যেন এখন সারা বিশ্বের জন্য অনুকম্পা দেখাইতে যাইতেছে। ইউরোপ আমেরিকা যখন কাঁপিতেছে করোনার কোপে, তখন চীন যেন পথ দেখাইতেছে কীভাবে করোনার থাবা হইতে মুক্তি পাওয়া যায়। করোনার প্রারম্ভিক শহর উহান এখন জয়ের শীর্ষে দাঁড়াইয়াছে। গত কয়েক দিনে উহানে কেহ নূতন করিয়া আক্রান্ত হয় নাই। উহানে জনবহুল এলাকায় করোনা-উপসর্গ পরীক্ষার জন্য জানুয়ারি হইতে যেই চেকপয়েন্টগুলি চালু ছিল, শুক্রবার হইতে সেইগুলি সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে। আর তাহাতেই উচ্ছ্বসিত উহানের জনগণ বাজি ফাটাইয়া স্বাগত জানাইয়াছেন নিজেদের ফিরিয়া পাওয়া স্বাধীনতাকে। একই চিত্র বেজিংয়েও।
অন্যদিকে সমগ্র ইউরোপ যেন পাগল হইয়া গিয়াছে। ভূমধ্যসাগরের তীরে ইতালি যেন কাঁপিতেছে থরো থরো করিয়া। ইতালির একটি আলোকচিত্র যে কাহারো মাথা খারাপ করিয়া দিতে পারে। উত্তর ইতালির বেরগেমো এবং লম্বার্ডিতে লাইন দিয়া চলিতেছে সাঁজোয়া ট্রাকগুলি। সেই ট্রাকগুলিতে রহিয়াছে সারি সারি লাশ। কোভিড-১৯-এ মৃতদের লাশ। কবরখানায় জায়গা নাই আর। তাই, শত শত ট্রাক চলিতেছে শহরের বাহিরে কোনো ‘নিরাপদ’ জায়গায় মৃতদেহগুলির সত্কার করিতে। কেবল গত শনিবারেই সেইখানে মৃত্যু হইয়াছে ৭৯৩ জনের। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে মারা গিয়াছে পৌনে ৫ হাজার মানুষ! এমন পরিস্থিতি অনুধাবন করা যায় ইতালির স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একটি উক্তিতে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী রোবার্তো স্পেরানজা বলিয়াছেন—‘ইতিহাসে যত কঠিন মুহূর্তের সাক্ষী আমরা, তাহার মধ্যে ইহাই সবচাইতে ভয়াবহ। একটা নূতন ভয়ংকর শত্রু আমাদের জীবনে ঢুকিয়া সকল কিছু উলট-পালট করিয়া দিয়াছে। সামনে আরো কঠিন সময়।’ মৃত্যুর মিছিলে ইতালির পর রহিয়াছে স্পেন। সেইখানে শনিবার পর্যন্ত মারা গিয়াছে ১ হাজার ৩৭৫ জন। ফ্রান্সে মৃত্যু হইয়াছে ৫৬২ জনের। ইহার মধ্যে নূতন মাথাব্যথার কারণ হইয়া উঠিয়াছে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র।
করোনা মহামারির চারটি ধাপ রহিয়াছে। বাংলাদেশ রহিয়াছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের মাঝামাঝিতে। ইতালির বিপর্যয় ধাপ হইতে আমরা দাঁড়াইয়া রহিয়াছি দুই-তিন সপ্তাহ দূরে। ইংল্যান্ড-আমেরিকাও প্রথমদিকে এই বিপর্যয় হইতে শিক্ষা গ্রহণ করে নাই। যেই ভুল অতি উন্নত দেশগুলি করিয়াছে, আমরাও কিছুটা দূরে থাকিয়া একই ভুল করিলে কোন অতল সুনামির তলে চাপা পড়িব, তাহা কল্পনা করিলে যে কাহারো গা শিহরিয়া উঠিবে। ভারত ইতিমধ্যে লকডাউন করিয়াছে। আমাদের শিক্ষা লইতে হইবে চীনের কাছ হইতে, কীভাবে সামাল দিতে হয়। শিক্ষা লইতে হইবে ইতালি, ইংল্যান্ড, স্পেন হইতে—ভুল করিলে কেমন খেসারত দিতে হয়। সামনে আরো কঠিন সময়—সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত লইবার।
