সাইফুল ইসলাম হাফিজ
২০১৬ সালে ইইউর সঙ্গে চুক্তি করে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনের শরণার্থীদের জায়গা দিয়ে যে মানবতার পরিচয় দিয়েছেন তাতে এরদোয়ান এবং তার দেশ সবার কাছেই বেশ প্রশংসিত হয়েছেন। অবশ্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বেশ কয়েক বার তার নিজ দেশে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাকে। যেমন, ২০১৬ সালের ১৫-১৬ জুলাই রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান ও তার সরকারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর এক ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়। যে পরিস্থিতি তিনি বেশ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই শান্ত করেছিলেন। এরপর গত বছর তার নিজ দল একে পার্টি থেকে কয়েক জন নেতা পদত্যাগ করে নতুন দল গঠন করেন। যারা নির্বাচনে বিজয় অর্জনের জন্য এরদোয়ানকে বেশ সহযোগিতা করেছেন। এবং গত বছর এপ্রিলের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ানের দল স্থানীয় নির্বাচনে রাজধানী আঙ্কারার দখল হারায়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) প্রার্থী মানসুর ইয়াভাস আঙ্কারায় পরিষ্কারভাবে বিজয়ী হওয়ায় তার দলের জনপ্রিয়তায় কিছুটা হলেও ধস নামে। বিশেষজ্ঞরা ১৬ বছরে ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ের মধ্যে এটিকে তার বড়ো বিপর্যয় মনে করেছিলেন। দল এবং নিজ জনপ্রিয়তাকে তুঙ্গে তুলতে এবং ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য এরদোয়ান একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বেছে নেন। যেটাতে তিনি সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। তুরস্কের শরণার্থী সমস্যা লাঘব করা সবকটি রাজনৈতিক দলেরই ইচ্ছা। সব তুর্কিরাই চায় তুরস্কের কাঁধ থেকে শরণার্থী বোঝা হালকা হোক। ৪০ লাখ শরণার্থীর বোঝা হালকা করার জন্য গত বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সিরিয়ায় ‘সেফ জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ২০১৯ সালের অক্টোবরের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার পরেই তুরস্ক কুর্দি এলাকায় কয়েক দিনব্যাপী জোরালো হামলা চালায়। এর আগে এরদোয়ান ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। কুর্দি মিলিশিয়াদের হটিয়ে ‘সেফ জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তুরস্কের সেনাবাহিনী ৯ অক্টোবর উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় অভিযান শুরু করে। অক্টোবর জুড়েই কুর্দি বনাম তুরস্কের সেনারা তীব্র যুদ্ধ করে। নিরাপদ অঞ্চল গঠন করে ২০ লক্ষ শরণার্থীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও তা নিশ্চিত করতে পারেননি এরদোয়ান। তবে প্রথম দিকে ৩ লাখ ১৫ হাজার ও শেষের দিকে আরো কিছু শরণার্থীকে ফেরত পাঠান। যাতে কিছুটা হলেও নিজ দেশে তার দলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ২০১৮-১৯ সাল জুড়ে আলোচনায় ছিল জামাল খাসোগি হত্যার ঘটনা। যেটা থেকে তিনি ফায়দা লুটতে সামর্থ্য হন। বর্তমানে সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রই ভাবছে। এর মধ্যে রাশিয়া ও তুরস্ক খুব বেশিই মাথা ঘামাচ্ছে। কারণ, রাশিয়া সমর্থিত আসাদ সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে যতই হামলা ও পালটা হামলা চালানো হচ্ছে ততই শরণার্থীর বোঝা তুরস্কের ঘাড়ে চাপছে। সম্প্রতি সিরিয়া ইস্যুতে ইদলিব সংকট দুই দেশেরই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সিরিয়ার ইদলিবে রুশ সমর্থিত আসাদ বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৩৪ তুর্কি সেনা নিহত হওয়ার পর পহেলা মার্চ তুরস্কও পালটা ড্রোন হামলা চালিয়ে (অপারেশন স্প্রিং শিল্ড) সিরিয়ার ১৯ জন সেনা নিহত করেছে। কিন্তু আঙ্কারার দাবি তারা ১২০ জনকে নিঃশেষ করেছে। এই টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সঙ্গে বৈঠকে বসেন এরদোয়ান। যেখানে সিরিয়ার ইদলিবে শান্তি ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এরদোয়ানের লক্ষ্য পুতিনের সঙ্গে আঁতাত করে ইদলিব পরিস্থিতি শান্ত করা। যাতে বড়ো যুদ্ধের হাত থেকে সবাই রক্ষা পায় এবং তার দেশ শরণার্থী সমস্যা লাঘব করতে পারে। উক্ত বৈঠকে এরদোয়ান ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। শুধু সিরিয়াই নয়, বিশ্বের আলোচিত-সমালোচিত প্রায় বিষয় নিয়েই মুখ খুলতে দেখা যায় এরদোয়ানকে। তার নেতৃত্বে তুরস্ক ড্রোন প্রযুক্তিতে বেশ উন্নতি লাভ করেছে। ইতিমধ্যে কাতার ও ইউক্রেনের কাছে নিজেদের তৈরি ড্রোন বিক্রিও করেছে তুরস্ক। নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছেন এরদোয়ান। ‘দ্য চেঞ্জ মেকার’ খ্যাত রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান তার মেধা আর নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়ে দীর্ঘ নয় বছর ধরে চলে আসা সিরীয় পরিস্থিতিকে শান্ত করবেন নাকি আরো উত্তপ্ত করে তুলবেন তাই এখন দেখার বিষয়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
