দেশ বাঁচাতে বাঁচাও নদী

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২০, ২১:৪৪

মো. মারুফ হোসেন

প্রাচীন যুগ থেকে মানুষ নদ-নদীর তীরবর্তী সমতল ভূমিতে বসবাস শুরু করে। পৃথিবীর সব সভ্যতা ও জনবসতি গড়ে ওঠার পিছনে নদনদীর ভূমিকা অনেক বেশি। নদ-নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল সব সভ্য জনপদ, নগর সভ্যতা। প্রাচীন মিশরে নীলনদ, পারস্য ও মেসোপটেমিয়ায় ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস, চীন দেশে ইয়াং সিকিয়াং, পাকিস্তানে অবস্থিত হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে সিন্ধু নদ, ভারতের বিভিন্ন নগর সভ্যতায় গঙ্গা এবং বাংলাদেশের মহাস্থানগড়ের পুণ্ড্রু নগরীতে করতোয়া নদী এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। আদিকাল থেকেই এদেশের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের চাষাবাদ ব্যবস্থা অনেকটাই সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সেচ কার্যে নদী একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। দেশে শস্য ও খাদ্যভান্ডার হিসেবে উপকূলীয় অঞ্চল বরিশাল বিভাগের পরিচিতি বহু পুরোনো। বরিশালকে বলা হয়—‘ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল’। এই প্রবাদটি নদী ও খালের সঙ্গে ধান উত্পাদনের সম্পর্ক স্পষ্ট করে দেয়।

বাংলাদেশর প্রায় শহর, নগর, বাণিজ্যকেন্দ্র নদীর তীরে অবস্থিত।  বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঢাকা মহানগরী, কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রাম, শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নারায়ণগঞ্জ শহর, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ময়মনসিংহ শহর গড়ে উঠেছে। দেশের প্রায় প্রতিটি শহর নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের পর্যটনকেন্দ্র। যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছে।

নদীমাতৃক এ দেশটি স্মরণাতীতকাল থেকে মত্স্য সম্পদে সমৃদ্ধশালী। আর মাছেভাতে বাঙালি—এ প্রবাদের আদি উত্স নদীই। নদী এ দেশের মানুষের প্রায় ৭০ শতাংশ মাছের চাহিদা পূরণ করে থাকে। নদীকে কেন্দ্র  করেই  তৈরি হচ্ছে বিদ্যুত্। বাংলাদেশে একমাত্র জলবিদ্যুেকন্দ্র কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত যা কাপ্তাই বিদ্যুেকন্দ্র নামে পরিচিত। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বাংলাদেশের বৃহত্তম এ বাঁধটির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হয়। আশীর্বাদ হিসেবে পাওয়া যে নদী আমাদের এত কিছু দান করে চলছে, সেই নদীর প্রাণ আজ হুমকির মুখে। হাট, বাজার, শহর, বস্তি এলাকার গৃহস্থের বর্জ্য ফেলার সবচেয়ে বড়ো ভাগাড় হয়ে উঠছে নদী। নদীর তীরে গড়ে ওঠা বেশির ভাগ শিল্পকারখানা তাদের বর্জ্য নদীতে ফলছে। এ সব দূষণের ফলে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

নদীনালা দখল করে স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি এখন নিত্য দিনের ঘটনা। সারাদেশে প্রায় ৪৯ হাজার ১৬২ জন দখলদারকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীনতার আগে দেশে সাত শতাধিক নদী ছিল। এখন আছে ৪০৫টি। বেসরকারি হিসেবে যার সংখ্যা ২৩০টি। পানির গুণমান হিসেবে দেশের ২৯টি নদী মারাত্মক দূষণের শিকার। ঢাকার চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোই হচ্ছে ঢাকার লাইফ লাইন। অথচ দখল আর দূষণের অতিষ্ঠ যন্ত্রণায় এ নদীগুলোর এখন মরণদশা। বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভার অধিকারী মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—নদী মরলে শুধু অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে না,  একই সঙ্গে জনজীবনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অভিঘাত নেমে আসে। নদী মরে যাওয়ার মানে মানুষের খাওয়ার পানি, মাছ, প্রাণীর বাসস্থান হারিয়ে যাওয়া। তবে ইতিবাচক খবর হচ্ছে, সারাদেশে অবৈধ দখলদারদের কবল হতে নদী-খাল মুক্ত করতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এবং তার কাজ দৃশ্যমান। সরকারের পাশাপাশি আমাদেরকেও নদীরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। কেননা, বাঙালির জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে  এসব নদনদী। এদেশের অধিবাসীদের জীবনযাত্রায় নদনদীর প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। তাই বলা চলে, দেশ বাঁচাতে, বাঁচাও নদী।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ধর্মতত্ত্ব অনুষদ,

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া