দেশের জন্য সামনের দুই সপ্তাহ খুব ঝুঁকিপূর্ণ আক্রান্ত আরো ৩

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২০, ২২:৩৬

এখন থেকে আগামী দুই সপ্তাহ দেশের জন্য সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল সময়, ভাইরোলজির ভাষায় যাকে ‘পিকটাইম’ বলা হয়। এ সময় প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারে অসংখ্য মানুষ। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা জানান, করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ স্প্রেডিং টাইমে প্রবেশ করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যারা ইতিমধ্যে দেশে এসেছেন, তাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোয়ারেন্টাইনে রাখা গেলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। তবে এখনো সময় আছে, সরকার যদি কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে বিদেশফেরতদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নিতে পারে, তাহলে ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সব রাজনৈতিক দল, সব পেশার মানুষ, সংগঠন, জনসাধারণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে সতর্কতার সঙ্গে নিয়ম মেনে চললে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসে দেশে নতুন করে আরো তিন জন আক্রান্ত হয়েছেন। এতে ভাইরাসটিতে দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ২৭ জন। এছাড়া সংক্রমিত রোগীদের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন আরো দুই জন। ফলে মোট সুস্থ হয়েছেন পাঁচ জন। তবে নতুন করে কারো মৃত্যু হয়নি। অর্থাত্, করোনায় দেশে মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত দুই জনই। গতকাল রবিবার বিকালে রাজধানীর মহাখালীর বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এতে সংস্থার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহভাজন হিসেবে আরো ৬৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে তিন জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে এক জন নারী, দুই জন পুরুষ। দুই জন বাইরে থেকে এসেছেন। অপরজন আরেক অসুস্থ রোগীর সংস্পর্শে থেকে আক্রান্ত হয়েছেন। ভাইরাসে এই তিন জন আক্রান্ত হলেও তাদের মধ্যে উপসর্গ মৃদুই দেখা গেছে। তাদের বয়স ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। তাদের এক জনের ডায়াবেটিস ও হাঁপানি আছে। তিনি বলেন, সর্বশেষ করোনায় আক্রান্ত ২০ জন চিকিত্সাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে এক জনের কিডনি ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হচ্ছে। এছাড়া ৪০ জন আইসোলেশনে রয়েছেন।

মিরপুরে যে বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে, তিনি কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের শিকার কি না, সেই প্রশ্নে ডা. ফ্লোরা বলেন, ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’ বলার আগে তারা আরেকটু সময় নিতে চান। তিনি বলেন, ‘মিরপুরে যে ব্যক্তি মারা গিয়েছেন, ঐ এলাকায় দুই জন বিদেশফেরতের সন্ধান পেয়েছি। তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা দেখতে চাই তাদের মধ্যে কোনো সংক্রমণ ছিল কি না, তাদের কাছ থেকে এসেছে কি না।’ তিনি বলেন, আরেক জনের ব্যাপারেও (সিলেট) আইইডিসিআর ব্যাপকভাবে তথ্য সংগ্রহ করছে। অন্যদের ক্ষেত্রে লক্ষণ উপসর্গ হওয়ার চার দিন আগে থেকে কন্টাক্ট ট্রেসিং করলেও তাদের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলেনে জানানো হয়, সিঙ্গাপুরে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। তিনি এখনো আইসিইউতে আছেন। বিশ্বের আরো কয়েকটি জায়গায় কয়েক জন বাংলাদেশি রোগী চিহ্নিত হয়েছেন বলে খবর এলেও আইইডিসিআর বিস্তারিত তথ্য পায়নি বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

৩ মৃত্যু করোনায় কি না, পরীক্ষা হচ্ছে :করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে সিলেটে আইসোলেশন ইউনিটে চিকিত্সাধীন এক নারী (৬১) গতকাল রবিবার ভোরে মারা গেছেন। যুক্তরাজ্যফেরত ঐ নারীর মুখের লালাসহ অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর। তার পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইনে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই নারী ৪ মার্চ যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পর থেকে তিনি জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভারতফেরত এক জনসহ দুই জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মতো উপসর্গ থাকলেও পরীক্ষা না হওয়ায় নিশ্চিত হতে পারেননি চিকিত্সকেরা। তাদেরও নমুনা সংগ্রহ করেছে আইইডিসিআর। পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর জানা যাবে তাদের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে। 

‘ক্রুশিয়াল টাইমের’ মধ্যে দেশ

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, চীনের উহানে প্রথম করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ তিন মাস সময় পেয়েছে। অথচ কোনো প্রস্তুতি নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এখন তারা হাসপাতাল প্রস্তুত করছে, আইসিইউ ব্যবস্থা করছে, সরঞ্জাম আনছে বিদেশ থেকে। অথচ শুরু থেকে দেশে কিট নেই, হাসপাতাল প্রস্তুত নয়, চিকিত্সকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই বলে সতর্ক করা হয়েছে। তারা কোনো কথাই কানে নেননি, এখন তার মাশুল দিতে হবে সবাইকে মিলে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, যে মানুষগুলো হোম কোয়ারেন্টাইনে গেছেন, তারা কিন্তু আসলে কোয়ারেন্টাইনে থাকছেন না। তাদের থেকে এখন এটা ছড়াবে। আর এটা ছড়ালে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ পাবে। তাই নিশ্চিতভাবেই আমরা এক  ‘ক্রুশিয়াল টাইমের’ মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আর  এজন্য সরকারকে আমাদের সবার সাহায্য করা দরকার। উপজেলা-জেলা হাসপাতালগুলোতে কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করতে হবে। করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তকরণ কেন্দ্র বাড়াতে হবে। এখনো সময় আছে, কোভিড-১৯  প্রতিরোধে একটি জাতীয় রেসপন্স টিম গঠন করা হোক। এর কার্যক্রম পরিচালিত হতে হবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। একইসঙ্গে এ টিমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মরত বিশেষজ্ঞদের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সম্পৃক্ত করতে হবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিদেশ ফেরতরা যদি দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টাইনে না থাকেন তাহলে করোনা মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। আর এটা হলে মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ কেউই রক্ষা পাবেন না।

ভাইরোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যেসব দেশে ভাইরাসটির ব্যাপক সংক্রমণ ঘটেছে সেসব দেশে প্রথম দুই থেকে তিন সপ্তাহ হাতেগোনা কয়েকজনের দেহে এটি শনাক্ত হয়। একটা পর্যায়ে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকে। এর কারণ প্রথমে দেশে প্রবেশ করা সেই দু-একজন ব্যক্তি তাদের পরিবার থেকে শুরু করে যত মানুষের সংস্পর্শে গিয়েছেন, তাদের অনেকের দেহেই ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। এই ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণগুলো প্রকাশ হতে সাধারণত দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন হয়। তাছাড়া সাধারণ সর্দি-কাশি বা ফ্লুর সঙ্গে এর উপসর্গগুলোর মিল থাকায় পরীক্ষা না করে, শুধু শারীরিক লক্ষণ দেখে এটি আলাদা করা সম্ভব হয় না।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ২০০-৪০০ পরীক্ষা করে আক্রান্তের সংখ্যা সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে না। বিদেশ থেকে গত ১৫ দিনে যে  পৌনে দুই লাখ লোক এসেছে, তাদের প্রত্যেককে কোয়ারেন্টাইনে রাখা জরুরি ছিল। এমন এক ডুবুন্ত আইসবার্গের সামনে এখন বাংলাদেশ যার শুধু মাথা দেখা যাচ্ছে, বাকি অংশ দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে এখনই সচেতন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আজ থেকে অ্যাপের মাধ্যমে ব্রিফ

আজ সোমবার থেকে জুম অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে করোনা ভাইরাস নিয়ে নিয়মিত প্রেস ব্রিফ করবে আইইডিসিআর। গতকাল বিকালে প্রতিদিনের ব্রিফিং শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এ তথ্য জানিয়ে বলেন, প্রতিদিন বেলা ১২টায় এ ব্রিফিং হবে। ব্রিফিংয়ে অংশগ্রহণের জন্য ই-মেইলে আমন্ত্রণপত্রও পাঠানো হবে। তখন আপনারা এই অ্যাপের মাধ্যমে ব্রিফিংয়ে অংশগ্রহণ করবেন।