করোনা নিজে বাঁচুন অন্যকেও বাঁচতে দিন

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২০, ২০:৫৮

এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো করোনা ভাইরাস। মানুষের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ হওয়ার সাথে সাথে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। ভাইরাসটি বাইরে এসে কয়েক ঘণ্টা বেঁচে থাকতে পারে। করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে হালকা থেকে গুরুতর লক্ষণ দেখা যায়। করোনা ভাইরাসের হালকা লক্ষণগুলো সাধারণত ফ্লু জাতীয় যেমন— সর্দি, কাশি, গলাব্যথা এবং জ্বর। যখন লক্ষণগুলো তীব্র হয়ে ওঠে, তখন শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বা কোনো ব্যক্তির মৃত্যুও হতে পারে।

করোনা ভাইরাস সংক্রামক

করোনা ভাইরাস এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে সংক্রামিত হয়। যখন কোনো ব্যক্তি কোনো মাস্ক ছাড়াই হাঁচি বা কাশি দেয়, তখন ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো সংক্রামিত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে বা সংক্রামিত বস্তুগুলিকে স্পর্শ করলে ভাইরাস এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে নোংরা ব্যাংক নোট থেকে করোনা প্রাদুর্ভাব ছড়াতে পারে বলে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

যাদের ঝুঁকি বেশি

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম বা ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টজনিত ব্যাধিগুলির মতো সমস্যায় ভুগছে সেই ব্যক্তিদের মারাত্মক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) সাথে বর্তমানে সবচেয়ে পরিচিত তিনটি শব্দ হলো— কোয়ারেন্টাইন, হোম কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন। এখানে এই তিন বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো—

কোয়ারেন্টাইন

কোনো ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে ঘুরে এলে বা রোগীর সংস্পর্শে এলে তার শরীরেও করোনা ভাইরাস বাসা বাঁধতে পারে। বাসা আদৌ বেঁধেছে কি-না বা সে আক্রান্ত কি-না এটা বুঝে নিতেই কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয় রোগীকে। কমপক্ষে ১৪ দিনের সময়সীমা এখানে। এই সময় রোগের আশঙ্কা থাকে শুধু, তাই কোনোরকম ওষুধপত্র দেওয়া হয় না; শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বলা হয়।

হোম কোয়ারেন্টাইন

কোনো ব্যক্তি যখন নিজের বাড়িতেই কোয়রান্টাইনের সব নিয়ম মেনে, বাইরের লোকজনের সঙ্গে ওঠাবসা বন্ধ করে আলাদা থাকেন, তখন তাকে হোম কোয়ারেন্টাইন বলে। এক্ষেত্রেও টানা ন্যূনতম ১৪ দিন আলাদা থাকতে হয়।

আইসোলেশন

কারও শরীরে করোনার লক্ষণ প্রকাশ পেলে এবং টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ হলে তাকে আইসোলেশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। আইসোলেশনের সময় চিকিত্সক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে থাকতে হবে রোগীকে। অন্য রোগীদের কথা ভেবে হাসপাতালে আলাদা জায়গা তৈরি করা হয় তাদের জন্য। অন্তত ১৪ দিনের মেয়াদে আইসোলেশন চলে। রোগের গতিপ্রকৃতি দেখে তা বাড়ানোও হয়। আইসোলেশনে থাকা রোগীর সঙ্গে বাইরের কারও যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না।

বাসায় সময় কাটাবেন যেভাবে

করোনা ভাইরাস নামক শত্রুকে ঘায়েল করার লক্ষে যার যার বাড়িতেই থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কর্মব্যস্ত দিন হঠাত্ স্থবির হয়ে গেলে জীবনযাপনে ভিন্নতা আসবেই। দীর্ঘদিনের অভ্যাস রাতারাতি বদলে ফেলা মুশকিল। তাছাড়া সারাদিন বাড়িতে থাকার বিষয়টি শুনতে সহজ মনে হলেও ততটা সহজ নয়। কারণ, একটা সময় আপনার বিরক্ত লাগতে শুরু করতে পারে। তাই বাড়িতে থাকার দিনগুলো সুন্দর করার জন্য বাছাই করা কিছু বই পড়ুন। বিখ্যাত কিংবা পছন্দের কিছু সিনেমার তালিকা তৈরি করে রেখেছেন অথচ দেখব দেখব করেও সময় পাচ্ছিলেন না? এবার তাহলে সময়টুকু কাজে লাগান। পছন্দের সিনেমাগুলো দেখে ফেলুন। কাজের চাপে পরিবারকে সময় দিতে পারেন না? এই সুযোগটি লুফে নিন। রং-তুলিতে আঁকিবুকি অনেকেরই শখ। কিন্তু ওই যে, ব্যস্ততা! এর কারণেই তো সব শখ মাটি করে চলতে হয়। তাই হঠাত্ পাওয়া অবসরে সেই শখটাকেই আবার ফিরিয়ে আনুন! অনুরাগের সবটুকু মিশিয়ে রঙিন করে তুলুন প্রিয় ক্যানভাসটি। কাজের চাপে সেযব আত্মীয়-পরিজনের খোঁজ নিতে পারেন না, একবার তাদের খোঁজ নিন। সম্ভব হলে কিছুটা সময় নিয়ে কথা বলুন। অবসর কাটানোর দারুণ আরেকটি উপায় হলো গান শোনা। এটি কিন্তু মন ভালো করার কাজও করে! পছন্দের গানগুলো শুনতে পারেন। সময় তো কাটবেই, মনটাও হবে ঝরঝরে। এসবের পাশাপাশি নিয়মিত খাওয়া, গোসল, প্রার্থনা সারুন। যেহেতু বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই তাই ঘরেই যতটুকু সম্ভব শরীরচর্চা করুন।

সন্তানকে সচেতন করুন

শিশুদের জানার পরিধি বড়দের মতো নয়। তাই যে কোনো বিষয় সম্পর্কে তাদের জানানো এবং সচেতন করার দায়িত্ব অভিভাবকদের। বর্তমানে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে পুরো বিশ্ব। এ বিষয়ে শিশুকে সচেতন করতে হবে আপনাকেই। সন্তানের সঙ্গে কথা বলার আগে নিজেকে সঠিক তথ্য জানতে হবে। করোনা নিয়ে প্রচুর ভুল ধারণা ছড়িয়েছে, কাজেই কোনটা সত্যি আর কোনটা ভুল সেটা আগে আপনাকেই জানতে হবে। ঠিকঠাক তথ্য হাতে থাকলে তবেই সন্তানের সব প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারবেন আপনি। ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়লে কীভাবে আরও অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কেন ফেক খবর ছড়ানো উচিত নয়, এ ব্যাপারে তাকে বুঝিয়ে বলুন। কোন কোন সূত্র থেকে সে সঠিক খবরগুলো পাবে, তাও জানিয়ে দিন।

গণপরিবহনে নিরাপদ থাকুন

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও বন্ধ হয়নি অফিস-আদালত। বাড়িতে বসে কাজ করার সুবিধাও নেই। তাই বাধ্য হয়েই বাড়ির বাইরে বের হতে হচ্ছে অনেককেই। জীবিকার প্রয়োজনে ছুটতে হচ্ছে বাসে-ট্রেনে। গণপরিবহনে করোনা থেকে নিরাপদ থাকার জন্য জেনে নিন বাস, মাইক্রোবাস, ট্রেন বা লঞ্চের সহযাত্রীটি প্রবল হাঁচি-কাশি-জ্বরে আক্রান্ত কি-না? তার থেকে যতটা সম্ভব দূরে সরে যান। প্রয়োজনে বাসের চালক-কন্ডাক্টর, অন্য সহযাত্রী বা সংশ্লিস্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষকেও সতর্ক করুন। রাস্তাঘাটে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে এলে রুমাল দিয়ে নিজের নাক আর মুখ ভালো করে চেপে ধরে রাখুন। রোগীকে স্পর্শ করবেন না। যত দ্রুত সম্ভব ওই জায়গা ছেড়ে চলে যান। যে সময়গুলোয় রাস্তাঘাটে লোকসংখ্যা বেশি থাকে, অর্থাত্ সকালে আর সন্ধ্যেবেলার অফিস আওয়ারে পারতপক্ষে রাস্তায় বের হবেন না। সম্ভব হলে সঙ্গে টিস্যু পেপারের প্যাকেট রাখুন। বাস-ট্রেনের হাতল ধরার সময় হাতে টিস্যু জড়িয়ে নিন। সেটা সম্ভব না হলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন। মুখে, নাকে একদম হাত দেবেন না। কারণ তাতে জীবাণু শরীরের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাইক শেয়ারিং রাইড ব্যবহার করলেও একই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

যেসব খাবার নিয়মিত খাবেন

এই সময়ে আতঙ্ক দূরে রেখে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান। সেইসঙ্গে— পর্যাপ্ত পানি পান করুন। সবুজ শাক-সবজিতে রয়েছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। এর মধ্যে যেগুলোতে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, মিনারেল ও ফাইবার রয়েছে সেসব শাক-সবজি খাওয়া উপকারী। টক জাতীয় ফলে আছে ভিটামিন সি যা সর্দি, কাশি, জ্বরের ক্ষেত্রে খুবই উপকারী। শরীরের উপকারী শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি করতে সাহায্য করে ভিটামিন সি। যে কোনো সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে ভিটামিন সি। রসুনে আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা ঠান্ডা লাগা ও ইনফেকশেন দূর করতে খুবই উপকারী। নিয়মিত টক দই খান কারণ, টক দই রোগের সঙ্গে লড়াই করার অন্যতম হাতিয়ার। অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ মধুর উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। প্রতিদিন এক চা চামচ মধু খাওয়ার অভ্যাস করুন।

মানসিক চাপ দূর করুন

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভীতি থেকে অবসাদে ভোগা, মনের উপর বাড়তি চাপ পড়া, হতবিহ্বল হয়ে পড়া, আতঙ্কিত হওয়া বা রেগে যাওয়া স্বাভাবিক। এই সময় আপনি যাদের উপর আস্থা রাখতে পারেন তাদের সঙ্গে কথা বলুন, পরামর্শ নিন। স্বজন আর বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। আপনি যদি বাড়িতে থাকতে বাধ্য হন তাহলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন। সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন, পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমান এবং হালকা ব্যায়াম করুন। তবে ধূমপান, তামাকজাত দ্রব্য, অ্যালকোহল বা অন্যকোনো নেশাজাত দ্রব্য গ্রহণ করে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করবেন না।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করার জন্য ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হলো— ক) অ্যালকোহলযুক্ত সাবান এবং পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নেওয়া। খ) অসুস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন। গ) আপনার যদি কোভিড-১৯ ধরা পড়ে তবে বাড়িতেই থাকুন। আপনার পরিবারের সদস্য বা অন্য মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে ভাইরাসগুলোর বিস্তারকে এড়িয়ে চলুন। এছাড়াও, কাশি বা হাঁচির আগে প্রতিবার মুখ ঢেকে রাখুন। ঘ) নোংরা হাতে মুখ, চোখ বা নাক স্পর্শ করা এড়িয়ে চলুন। ঙ) আপনার চারপাশ পরিষ্কার করতে জীবাণুনাশক ব্যবহার করুন। এছাড়াও এই রোগের বিস্তারকে সীমাবদ্ধ করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা মাস্ক পরার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদিও এটি কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর, তবে অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করতে নিশ্চয়তা দেয় না। কিন্তু, মাস্ক পরা আপনাকে কাশি বা উন্মুক্তভাবে হাঁচি দেওয়া থেকে বিরত রাখবে এবং অন্যের সংক্রামিত তরল থেকে আপনার নাক বা মুখে প্রবেশ করতে বাধা দেবে।