রেলের তৈল চুরি কি বন্ধ হইবে না?

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২০, ২১:২৩

রেলের  তৈল চুরির ঘটনা বহুদিনের। এই ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপসহ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হইলেও বাস্তবে তাহার প্রতিফলন দেখা যাইতেছে না। কথায় বলে : সরকারি মাল, দরিয়ামে ঢাল। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষেত্রে নয় ছয় করিবার মানসিকতা আমাদের যেন মজ্জাগত হইয়া গিয়াছে। এই দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষত ট্যাক্সপেয়ার বা করদাতারা অসচেতন বলিয়াই এমন ঘটনা ঘটিতে পারিতেছে। যুগের পর যুগ ধরিয়া লোকমুখে প্রচলিত উপর্যুক্ত আপ্তবাক্যের মিল রহিয়াছে রেলের তৈল চুরির ক্ষেত্রেও। রেলওয়েকে আলাদা মন্ত্রণালয়ে রূপান্তরিত করিবার পর আশা করা হইয়াছিল যে, এই সকল ক্ষেত্রে উন্নতি হইবে; কিন্তু এখনো একই চিত্র বিরাজমান। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বত্সর যাত্রী ও মালবাহী    ট্রেন হইতে অন্তত শতকোটি টাকার তৈল চুরি হইতেছে। ট্রেনের একশ্রেণির অসাধু চালক, গার্ড, লোকোশেডের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চিহ্নিত অপরাধীদের সমন্বয়ে শতাধিক সিন্ডিকেট গড়িয়া উঠিয়াছে, যাহারা জড়িত এই তৈল চুরির ঘটনার সহিত; কিন্তু ইহার কোনো প্রতিকার হইতেছে না।

গত ১৭ মার্চ র্যাবের একটি দল ঈশ্বরদী জংশন এলাকার ফতেমোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালাইয়া রেলের ইঞ্জিন হইতে চুরি করা সাড়ে ৪ হাজার লিটার তৈলসহ একজনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে। এইভাবে গত এক মাসে র্যাব একই এলাকা হইতে ৪০ হাজার লিটার জ্বালানি তৈল উদ্ধার করিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, গত ছয় মাসে পশ্চিমাঞ্চল রেলের বিভিন্ন স্টেশন এলাকায় অভিযান চালাইয়া লক্ষাধিক লিটার তৈল উদ্ধার করা হইয়াছে। অভিযোগ রহিয়াছে, ডিপো কর্মচারী, ট্রেনের চালক ও গার্ডদের সহায়তায় দুর্বৃত্তরা এই তৈল চুরি করিয়া বাজারে বিক্রয় করিয়া দেয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হইতে রেলের তৈল চুরি ঠেকাইতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে; কিন্তু তাহাতেও কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙিতেছে না।

এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাদেশে প্রতিদিন ৩৫০ ট্রেন চলাচল করে। এই সকল ট্রেনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পৌনে ২ লক্ষ লিটার ডিজেল লাগে। এই হিসাবে বত্সরে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি লিটার ডিজেল খরচ হয়। তাহার মধ্যে প্রতি বত্সর চুরি হইয়া যাইতেছে প্রায় দেড় কোটি লিটার ডিজেল, যাহার বাজারমূল্য কমপক্ষে ৯৪ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। শুধু  তৈল নহে, বত্সরে প্রায় ১ কোটি টাকার মবিলও চুরি হইয়া যাইতেছে। রাষ্ট্রের এই বিপুল ক্ষতি কিছুতেই মানিয়া লওয়া যায় না। এইরূপ অনিয়ম রেলওয়ের লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ। ইতোমধ্যে রেলের উন্নয়নে অন্তত ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ করিবার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হইয়াছে; কিন্তু চুরি-দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করিতে না পারিলে এই সকল পরিকল্পনা হইতে মানুষ শেষ পর্যন্ত খুব একটা লাভবান হইবেন বলিয়া আশা করা যায় না। সুলভ ও নিরাপদ যোগাযোগের মাধ্যম রেল খাত নিয়া কূটচাল ও অবহেলা অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে।