আগামী ১৪ দিন পর যদি দেশে করোনার সংক্রমণ এবং করোনার মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায় বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের দেশে আনার কারণে দেশের সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার দায়দায়িত্ব মুখ্য করোনা নিয়ন্ত্রক সংস্থার। যারা যথাযথ টেস্ট, স্ক্রিনিং বা কোয়ারেন্টাইন ছাড়া বিদেশফেরত ব্যক্তিদের নির্বিচারে জাতীয় বিমানে এনে ঐ বিমানের সব আরোহী ও ক্রুসহ দেশের বিমানবন্দরের কর্মী ও গণমানুষকে ঝুঁকিতে ফেলল তাদের বিশাল দায়টি বুঝতে হবে!
প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত অভিজ্ঞতার আলোকে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, করোনা ভাইরাস নামক আরএএন ভাইরাস যা কোল্ড ভাইরাস নামে পরিচিত তা অত্যন্ত ছোঁয়াচে; এটি যেমন হাঁচি, কাশির মাধ্যমে মাইক্রোড্রপলেট আকারে ছড়ায়, তেমনি রোগীর ব্যবহার্য, পরিবেশে বিদ্যমান কাপড়, প্লাস্টিক, ধাতব ও অন্যান্য ফোমাইটের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। মাইক্রোড্রপলেট আকারে বাতাসে ভাসমান ভাইরাস প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা জীবিত থাকলেও ধাতব ও প্লাস্টিকসহ অন্যান্য ফোমাইটে আঠার মতো লেগে তা তিন দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এ কারণে এটি প্রতিরোধে বহুমুখী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণ যাচাই করে দ্রুত পরীক্ষায় এনে কোয়ারেন্টাইনে আনা যেমন অবশ্য করণীয় তেমনি আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা প্রতিটি ব্যক্তি, বস্তুসহ তার পরিপার্শ্বের একটি মূল্যায়ন প্রয়োজন। সংস্পর্শে আসা মানুষের পরীক্ষাসহ তাদের আইসোলেশন এবং তাদের পারিপার্শ্বিক ডিজইনফেকশন প্রক্রিয়া অতি অপরিহার্য।
এ ক্ষেত্রে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, ৬০ শতাংশ অ্যালকহলের মতো সাবান ও ক্লোরিন দ্রবণ এই ভাইরাস মেরে ফেলতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে প্রতিটি ফোমাইটকে বা রোগীর সংস্পর্শে আসা বস্তুকে চার মিনিট ঐ দ্রবণের সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে হবে। ব্যবহূত কাপড়গুলো সাবান দিয়ে সিদ্ধ করে ভাইরাসগুলো মেরে ফেলা যেতে পারে। দরজার হাতল, পানির কলের নব, টয়লেট ও গণপরিবহনের আসন ও হাতলগুলো ডিজইনফেক্ট করা অতি জরুরি। এর জন্য মাস্ক, ফিউমিগেশন; কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউভি রেডিয়েশন বা কোমল এক্সরে কার্যকর হতে পারে। তামার পাতের শিল্ড লাগানো হিটার ভাইরাস কমাতে সাহায্য করে— এটা আমি ২০০২-এ সার্স নিয়ে কাজ করার সময় দেখেছি। তাপমাত্রা ৬০-৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে ভাইরাসের মৃত্যু হবে। ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এটা নির্জীব হবে এবং সংখ্যায় কমবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সার্স ও ফ্লু চিকিত্সায় যে ওষুধগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তার কিছু কিছু ওষুধ করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় পরামর্শ মতো ফ্যাভিপিরাভির দিয়ে রোগাক্রান্তদের চিকিত্সা শুরু করে প্রতিরোধ বাড়াবার জন্য বিটাকাপ্পা ইনহিবিটরগুলো বিশেষ করে সেলিনিয়াম ও জিঙ্কের ব্যাপক ব্যবহার প্রয়োজন। জিঙ্ক ডায়ারিয়া ও নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হার কমিয়ে আনে। এক্ষেত্রে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন যা এইডস প্রতিরোধ সিডিসিকে এক সময় ব্যবহার করতে বলেছিলাম যা কি না রিউমটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগে ইম্যুউন মডুলেটের হিসেবে ব্যবহার করা হয় তা করোনা ভাইরাস সংক্রমণে প্রয়োগ করতে বলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বয়স বিবেচনা করে নির্বাচিত ক্ষেত্রে চোখের রেটিনার সমস্যাটি বিবেচনায় এনে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ঢালাওভাবে ব্যবহার করা কখনো নয়। যে বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি বাতরোগে ভুগছে ও ইম্যুইনোডিফেসিয়েন্সিতে ভুগছে তাদের জন্য ইন্টারফেরন এবং হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন কিছু কাজে আসতে পারে। এ সংক্রান্ত সব পরীক্ষানিরীক্ষা বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে আইসোলেশন ও টেস্টের কোনো বিকল্প নাই। করোনা টেস্ট কিট হাতে না আসা পর্যন্ত ইনফ্লুয়েঞ্জার টেস্ট করে এক্সক্লুশন পদ্ধতিতে সিদ্ধান্তের কাছে আসা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জার ওষুধগুলো এবং কিছু ভাইরিসাইডাল কাজে আসতে পারে। আমাদের হাতে এমন কিছু ওষুধ রয়েছে। ব্যাপকভাবে ফ্লু ভ্যাকসিন দেওয়া প্রয়োজন। এটা ফ্লুজনিত মৃত্যু কমিয়ে আনবে। চিকিত্সক, নার্স ও জনগণের ব্যবহারের জন্য মাস্ক ও টোটাল প্রটেকশন পিপিই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর অভাবে ২০ জন আক্রান্তের চিকিত্সায় সাত জন চিকিত্সক করোনা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে ডাক্তারের ঝুঁকির হার ১ঃ৩। এটা অনেক বড়ো ঝুঁকি। এ ঋণ কীভাবে পরিশোধিত হয়! ডাক্তারদের প্রতি মানবিক হওয়া অতি প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন—প্রচলিত মাস্ক যার ভেতরের ফুটোগুলো দুই মাইক্রোনের বেশি বা যেগুলো এন-৯৫ নয় তার ব্যবহার কোনো সুফল বয়ে আনবে না। এটি পরিধানের পদ্ধতি রয়েছে। মাস্কের সঙ্গে সঙ্গে গ্লাভস ও চোখে চশমা পড়া প্রয়োজন। ডাক্তারদের প্রটেকটিভ গাউন, টুপি, জুতা, চশমা অত্যাবশ্যক। প্রতিটি হাসপাতালসহ রোগীর আস্তানা, গণসমাবেশের স্থানগুলো ও বিমানসহ সব যানবাহন ব্যাপকভাবে ফিউমিগেশন করা প্রয়োজন এবং কিছুক্ষণ পর পর জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে ফেলা প্রয়োজন। গণসমাবেশের স্থানগুলোতে ডিসইনফেকটিংয়ের চেম্বার তৈরি করা যেতে পারে। হাসপাতাল, ডাক্তাদের চেম্বার ও করোনার ছোঁয়া পাওয়া স্থানগুলোতে তামার শিল্ডযুক্ত হিটার ও ইউভি লাইটের সহায়তায় ভাইরাসের জন্য অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। কেমিক্যালস ও ফিউমিগেশন তো আপন স্থানে রয়েছে। বাড়িঘর, পরিধেয় বস্ত্র এবং বিছানাগুলো কড়া রোদে দেওয়া প্রয়োজন। যা কিছু ধৌত করা সম্ভব তা সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা প্রয়োজন। ক্লোরিন দ্রবণ না পেলে ১ চামচ ব্লিচিং পাউডার, ১ লিটার সাবান ও ফিটকিরি দ্রবণে মিশিয়ে তা ডিজইনফেকশন কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি ত্বকের জন্য নয়। এ সব কাজে গ্লাভস পরতে হবে।
করোনা শনাক্তে কিট তৈরি করে গণস্বাস্থ্য ১৫ দিনের মধ্যে তা হাজির করবে—এটি একটি সুখবর। ব্যাপক টেস্টের জন্য কিট হাজির করা এখনই সরকারের আশু দায়িত্ব। অধিকতর আক্রান্ত দেশ থেকে ফেরত আসা সব ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়ে, এ যাবত্ আসা বিদেশফেরত এবং তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা প্রয়োজন এখনই। সর্বোপরি আতঙ্ক, অজ্ঞতা, নির্বোধ বাচালতা পরিহার করে এই মহাদুর্যোগের নানামুখী আঘাত, জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং আর্থিক দুর্যোগ বিবেচনায় এনে মোকাবিলায় সব শক্তি ও মেধা প্রয়োগ করতে হবে। আসুন চীনের উহান প্রতিরোধ মডেলটি আমরা অনুসরণ করি।
n লেখক :ইমার্জিং ডিজিজ ও অ্যাজমা বিশেষজ্ঞ
