কোভিড-১৯ :ইতালির বিলাসিতার পরিণাম

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২০, ২১:২৪

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)-এর তাণ্ডব অব্যাহত থাকায় ইতালি, বিশেষ করে উত্তর ইতালির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইউরোপের যে কোনো অঞ্চলকে ছাড়িয়ে গেছে। ইতালি এখন করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে। এ লেখা পর্যন্ত এ রোগে ৪ হাজার ৮২৫ জন মারা গেছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৫৩ হাজার ৫৭৮-এ দাঁড়িয়েছে। দেশটির যেসব অভিজাত চামড়াশিল্প-কারখানায় চীনা শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি সেখানে করোনা ভাইরাসে বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘটনাচক্রে চীনের উহান প্রদেশকে করোনা ভাইরাসের উত্সভূমি বিবেচনা হরা হচ্ছে এবং এখান থেকে তা বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়েছে। এতে হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে। এমনকি রোগটি সারা দুনিয়ার অর্থনৈতিক বাজারকে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করছে।

ইতালিতে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটার পর ক্রমবর্ধমান হারে আক্রান্ত ও মৃতের ঘটনায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এই ঘটনা দুর্ঘটনাবশত না পরিকল্পিত। যখন সারা বিশ্ব এ বিষয়ের একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছে ‘করোনা ভাইরাস :বিলাসিতা ও ফ্যাশনের মূল্য’ শিরোনামে রবার্ট স্টেসি ম্যাককেইনের একটি বিশেষ প্রতিবেদন তখন চীনা এই রোগের সঙ্গে ট্যাগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উত্তর ইতালির বস্ত্র ও চামড়াশিল্পে বিপুলসংখ্যক চীনা উদ্যোক্তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনা হয়েছে। সেই সঙ্গে তারা কারখানায় কাজ করার জন্য বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চীন থেকে নিয়ে আসে। ২০১০ সাল নাগাদ ইতালির শিল্পনগরী ফ্লোরেন্সে চীনাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০ হাজার। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এ মাসের গোড়ার দিকে ইতালিতে করোনা ভাইরাসের বিস্তার এবং এর ফলে সরকার দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করার পর বেশ কয়েকটি মার্কিন সংস্থা কেবল একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছে—‘ইতালি কেন?’

অধিকাংশ উত্তরই জনসংখ্যা ও বর্ষীয়ান নাগরিকদের বিষয় নিয়ে ঘুরপাক খেয়েছে। এটা ঠিক ইতালিতে অন্যান্য দেশের তুলনায় বয়স্ক লোকের সংখ্যা বেশি। এদিকে উত্তর ইতালির বহু বাসিন্দা তাদের চামড়া ও বস্ত্র কারখানাগুলো চীনাদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। এর পরও ইতালির সরকার এসব কারখানায় কাজ করার জন্য ১ লাখ শ্রমিককে চীন থেকে নিয়ে আসার অনুমতি দেয়। তারা সরাসরি উহান থেকে উড়ে ইতালিতে আসতে থাকে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগ পর্যন্ত এই একতরফা যাত্রা অব্যাহত ছিল। কাজেই কোভিড-১৯ কেন গন্তব্য হিসেবে ইতালিকে বেছে নিল তা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়।

তাদের কেউই অবশ্য ইতালির উত্তরাঞ্চলে বস্ত্রশিল্পে হাজার হাজার চীনা শ্রমিকের কাজ করার কথা প্রকাশ করেনি। এখানেই গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে। ইতালিতে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের স্থান, আকার ও সময় বিবেচনায় এটা নিশ্চিত যে রোগটি সরাসরি চীন থেকে ইতালিতে আমদানি হয়েছে। গত জানুয়ারিতে ইতালিতে যে দুই জনের দেহে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে তারা ছিলেন চীনা পর্যটক। এর ঠিক তিন সপ্তাহ পর ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় লমবার্ডি প্রদেশের বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়স্ক এক লোক শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ৩৬ ঘণ্টা অপেক্ষার পর পরীক্ষা শেষে জানা যায় তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। এরই মধ্যে হাসপাতালের স্টাফ, দর্শনার্থী বন্ধু ও আত্মীয়স্বজন তার সংস্পর্শে আসেন। ১৯ ফেব্রুয়ারির ঐ ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে লোমবার্ডির বাসিন্দা কীভাবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেন? কেন ইতালির উত্তরাঞ্চলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব, অন্য এলাকা নয় কেন? উত্তর পরিষ্কার—‘ইতালিতে তৈরি’ বিলাসী সামগ্রী সস্তায় লাভের জন্য আমদানি করা শ্রমিকরাই এই মহাদুর্যোগের জন্য দায়ী। এখন বিলাসিতার পূর্ণমূল্য তাদেরকে দিতে হচ্ছে এবং তা দুঃখজনকভাবে খুবই চড়া। লমবার্ডি ও তাসকানি এলাকায় চীনের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি। চীনের বাইরে ইতালিতেই করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রদুর্ভাব ঘটেছে এবং লমবার্ডি হচ্ছে দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল। নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে ইতালির ফ্যাক্টরিগুলোতে বিপুলসংখ্যক অবৈধ চীনা অভিবাসী শ্রমিক কর্মরত থাকার ব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চোখ বন্ধ করে থেকেছে। চীনা মাফিয়ারা এই নিয়োগের কলকাঠি নেড়েছে। গবেষকদের মতে, উহান ভাইরাসে আক্রান্তদের ৮০ ভাগের ক্ষেত্রে রোগের তেমন উপসর্গ ছিল না এবং কারো কারো ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণই ধরা পড়েনি। রোগটি দ্রুত সংক্রমিত হওয়ার পেছনে প্রধানত সুস্পষ্ট উপসর্গেও অভাবকে দায়ী করা যেতে পারে। ইতালি থেকে পাওয়া কোনো রিপোর্টেই আক্রান্তদের কতসংখ্যক চীনা তার উল্লেখ ছিল না। কিন্তু মার্চের গোড়ার দিকে ইতালিতে করোনা ভাইরাস এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে সংক্রমণ ভিন্ন গতিপথেও অগ্রসর হয়। ইতালিফেরত চীনা শ্রমিকরা সঙ্গে করে এই রোগ নিয়ে যান, এমনটাই বলা হচ্ছে।

কাজেই এটা পরিষ্কার, ইতালিতে এই রোগ রপ্তানির ক্ষেত্রে সন্দেহের তির চীনের দিকেই।

n লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক