শাহনেওয়াজ বাবলু
ছোটোবেলায় তেমন কোনো স্বপ্নই ছিল না তার। তবে বাবা-মা তাকে স্বপ্নের বীজটা বুনে দিয়েছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই ছিলেন দুরন্ত। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, নাচ-গান নিয়েই সময় কাটত তার। বেড়ে ওঠা যৌথ পরিবারে। ইচ্ছা ছিল সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করার। কিন্তু বাবার ইচ্ছায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ব্যস্ত থাকতেন বিতর্ক, ম্যুট কোর্ট, বিভিন্ন এনজিওর কাজে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই বিচারক হওয়া। বলছিলাম সহকারী বিচারক আরিফা চৌধুরী হিমেলের কথা। বরিশালের মেয়ে হিমেলের বর্তমান কর্মস্থল মানিকগঞ্জে। তিনি বলছিলেন, বাবা চেয়েছিলেন আমি যেন বিচারক হই। আর বাবার স্বপ্নই ছিল আমার স্বপ্ন। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হিমেল বলেন, ছোটোবেলা কেটেছে বরিশাল শহরে। স্কুল-কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, নাচ, গান করতে ভালো লাগত। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কখনো কিছু শেখার সুযোগ হয়নি। আমার ফুফু এবং বড়ো বোনের কাছে নাচ, গানের হাতেখড়ি। এরই মধ্যে নতুন কুড়িতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। পরিবার থেকে বলা ছিল রেজাল্ট ভালো না হলে কোনো কিছুই করা যাবে না। তাই পড়াশোনা ঠিক রেখেই সবকিছু করতে হতো। বিচারক হওয়ার গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০০৭ সালে আমি বরিশাল ব্যাপটিস্ট মিশন স্কুল থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাই। পরে অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাশ করি। আমার ফুফু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে কাজ করতেন। তিনি সব সময় দেশ-বিদেশের গল্প বলতেন। উত্সাহ দিতেন পড়াশোনা করার, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। কলেজে থাকা অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন বাসা বাঁধে। ঢাবিতে পড়তে হবে এমন একটা জেদও কাজ করেছিল মনের মধ্যে।
আর আমার বিচারক হওয়ার স্বপ্নটা ছিল বাবার। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পঞ্চম হই। রেজাল্ট জানার সঙ্গে সঙ্গেই বাবা বলেছিলেন, আইনে পড়তে হবে। যাতে আমি বিচারক হতে পারি। আইন পড়া শুরু করলেও ছাত্রজীবনে এক দিনের জন্যও বিচারক হওয়ার কথা ভাবিনি। তারা চাইতেন আমি যেন বিচারক হই। তাই ভাবলাম, একবার অন্তত চেষ্টা করে দেখি। সহকারী বিচারক পরীক্ষার প্রথম ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই আমি জানতে পারি যে, মা হতে যাচ্ছি। পরবর্তী সময়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্ট হলেও আমার স্বামী ও পরিবারের সবার সহযোগিতায় সুস্থভাবে পরীক্ষা দিয়েছি। রেজাল্ট পাওয়ার কিছুদিন পরে আমার ছেলে আরহানকেও কাছে পেয়েছি। আমার এখনো মনে হচ্ছে বিচারক হওয়ার পেছনে আমার ছেলেরও কিছুটা আশির্বাদ রয়েছে।
বিচারক হওয়ার পরে প্রথম তিন মাস সিনিয়র বিচারকদের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে আমার। তবে যেদিন আলাদা এজলাস করি তখন খুব একসাইটেড ছিলাম। বিচারক হওয়ার প্রথম দিনটা আমার খুব ভালোই কেটেছে। সবাই আমাকে সবদিক দিয়ে সহযোগিতা করেছে। এক জন নারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমি তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুক্ষীণ হইনি। আমার জেলা জজ এবং এডিশনাল জজ ছাড়াও বেশিরভাগ বিচারকই নারী। নারী-পুরুষ নয়, আমাদের সার্ভিসে সবাইকে বিচারক হিসেবেই ট্রিট করা হয়। এক জন নারীকে সফল হতে হলে অবশ্যই তার লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। আর দ্বিতীয়ত দেখতে হবে সমাজে এবং পরিবারে তার পরিস্থিতিটা কেমন। সেই হিসেব করেই একজন নারীকে তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে এগোতে হবে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে মেয়েরাও এখন অনেকটাই এগিয়ে যাচ্ছে।
আমি কথা বলতে খুব পছন্দ করি। আমি প্রচুর কথা বলি। আমার পেশায় ততোটা কথা বলার তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। তবে এজলাসে যে আমরা চুপ করে থাকি, কথা বলার সুযোগ থাকে না, সেটা কিন্তু না। আইনেই বলা আছে, আইজীবীদের যেখানে কোনো বিষয় ধরিয়ে দেওয়া দরকার সে বিষয়ে আমাদের কথা বলার সুযোগ রয়েছে। মূলত পড়াশোনা কালে আমি একজন বিতার্কিক ছিলাম। সেই থেকেই কথা বলাটা পছন্দে পরিণত হয়।
