সর্পপ্রেমিক মাহফুজ

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২০, ১৮:২৮

>> মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

 

সাপ! নাম শুনলেই আঁতকে ওঠে বুক। কেউ লাঠি নিয়ে মারতে যান। কেউ-বা দৌড়ে পালান। তিনি এর কোনোটাই করেন না। পরম মমতায় সাপ ধরেন। চিকিত্সার প্র্রয়োজন হলে তা-ও করেন। তারপর উপযুক্ত পরিবেশে ছেড়ে দেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় একশটি সাপ রেসকিউ করেছেন। কামড়ও খেয়েছেন চারবারের মতো। বলছিলাম সর্পপ্রেমিক মাহফুজুর রহমানের কথা। তিনি পড়াশোনা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে। তখন মাহফুজ ক্লাস ফোরে পড়েন। একদিনের ঘটনা। প্রাইভেট পড়ে ফিরছিলেন। ড্রেনের উপরে একটি সাপ দেখে তার মায়া হলো। সাপটাকে বোতলে ভরে বাসায় নিয়ে এলেন। মা-বাবা দেখে একটু অবাকই হলেন। তাকে বোঝালেন। সাপ পালনের জিনিস নয়। এ পর্যায়ে বাবা তাকে মারধরও করলেন। এই ঘটনার ঠিক ১৫ দিন পর আরেকটি সাপ বাসায় নিয়ে আসে মাহফুজ। তখন আর তার বাবা কিছু বলেননি। তখন কোনটা বিষধর, কোনটা অবিষধর তিনি জানতেন না। সাপুড়েদের সঙ্গে থেকে তিনি প্র্রাথমিকভাবে সাপ ধরা শিখেন। পরে প্র্রচুর পড়াশোনা করেন সাপ নিয়ে। ২০১৫ সালের ঘটনা। মাহফুজ তখন সরকারী মাগুরা কলেজে পড়েন। গ্রন্থাগারের সামনে একদিন দেখলেন, লোহার কোচ দিয়ে এক লোক একটা সাপকে আঘাত করছে। ভাগ্য ভালো, সাপটি কোচের দুই লোহার মাঝে পরে। আহত সাপটিকে নিয়ে এসে চিকিত্সা করে ছেড়ে দেই। বলছিলেন মাহফুজ। এটিই ছিল তার প্রথম সাপ রেসকিউয়ের ঘটনা। আরেকবার প্রায় ৩০টি কোবরার বাচ্চা রেসকিউ করেন মাহফুজ। মাহফুজ বলেন, আগে জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটি এলাকায় মানুষ প্র্রচুর সাপ পিটিয়ে মেরে ফেলত। আমি রেসকিউ করায়, এখন আর মারে না। আমাকে খবর দেয়। সাপ ধরে এনে নিরাপদ পরিবেশে ছেড়ে দেই। কিছুদিন আগে তিনি ধরেন ক্যাটারস কুকরি নামে এক সাপ। ঢাকার মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো ধরা পড়ে বলে জানান মাহফুজ। ফরিদপুর গিয়ে ধরেছিলেন খরিস গোখরা। তিনি জানান, ২০১৯ সালের শুরুটাই হয় কালনাগিনির ছোবল খেয়ে। মাগুরা থেকে সাপটি ধরেছিলেন। ছাড়ার সময় ছোবল বসিয়ে দেয়। কামড় না খেয়ে সাপ রেসকিউ করাই একজন রেসকিউকারীর সফলতা বলে তিনি মনে করেন। মাহফুজ বলেন, সাপকে অনেক দিন পানি না খাইয়ে রাখা হয়। তারপর দুধে পানি দিয়ে সাপুড়েরা খেতে দেয়। জীবন বাঁচাতে সাপ তা খেয়ে থাকে। মানুষকে চিনে রাখা সাপের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। মাহফুজের কার্যক্রম পুরোটাই স্বেচ্ছাশ্রম। পড়াশোনার ফাঁকে কাজ করেন। পকেটের টাকা খরচ করে বিপদগ্রস্ত মানুষের কাছে ছুটে যান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে তার ফোন নম্বর এখন অসংখ্য মানুষ জানে। মাত্র তিন চারটি কামড় খেয়েছেন তিনি। অথচ প্রায় একশত সাপ রেসকিউ করেছেন। এটা অবশ্যই একজন রেসকিউকারীর জন্য চরম সফলতা। কারণ তারও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। মাহফুজ বললেন, সাপ ধরার বিশেষ গাম বুট আছে। সেটা তার নেই। হুক দিয়ে সাপ ধরেন। তবে তার প্র্রয়োজন ব্ল্যাক ক্লেইট। সাপ ধরার আধুনিক যন্ত্রপাতিও নেই। সাপ ধরা এবং ছেড়ে দেওয়ার একটি লাইসেন্সও প্র্রয়োজন তার। ব্যক্তিগতভাবে সাপের মতো উপকারী প্রাণী রক্ষায় দেশে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন কাজ করছেন বলে জানা যায়। এদের মধ্যে মাহফুজের সফলতা সবচেয়ে বেশি। ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্ন্যাক রেসকিউ আর্গানাইজেশন-এর প্র্রতিষ্ঠাতা এবং সভাপতি মাহফুজুর রহমান। সংগঠনটির সদস্যরা সাপ রেসকিউ করেন। আবার পরিবেশ প্র্রকৃতি সুরক্ষার কথাও বলেন। ডিপ ইকোলজি হলো একটি দার্শনিক আন্দোলন। সংগঠনটির ফেসবুক পেইজে সদস্য সংখ্যা দশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।