যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২০, ২১:৫১

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বিশ্বের সবচাইতে ক্ষমতাধর ব্যক্তি বলিয়া মনে করা হয়। তিনি চাহিলেই বিশ্বে কোনো বড়ো ধরনের পরিবর্তন আনিতে পারেন। তিনি পারেন যে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিতে; কিন্তু দেশের ভিতরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলে কতটুকু ক্ষমতাধর? দুই দিন পূর্বের একটি উদাহরণ তুলিয়া ধরা যায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আশঙ্কা করিতেছিল—কোভিড-১৯-এর প্রকোপে দ্রুতই আমেরিকায় কর্মহীনের সংখ্যা ২০ শতাংশে চলিয়া যাইতে পারে। এই ভাইরাসের কারণে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়িতে যাইতেছে আমেরিকার অর্থনীতি। এই কারণে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্টিভ মানচিন গত সপ্তাহে বলিয়াছেন, আমেরিকানদের বর্তমান ভূতুড়ে জীবনব্যবস্থায় নগদ অর্থের প্রয়োজন এবং প্রেসিডেন্টও সেই অর্থ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বরাদ্দ করিতে চাহেন; কিন্তু সিনেটে গত রবিবার ভোটাভুটিতে আটকাইয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি রক্ষায় ট্রিলিয়ন ডলারের সেই প্রণোদনা প্রস্তাব।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে মার্কিন অর্থনীতি, নাগরিক ও সংকটে থাকা ব্যবসাগুলিকে সহায়তার জন্যই মূলত ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন কিংবা প্রয়োজনে আরো বেশি অর্থায়নের জন্য বিল প্রস্তাব করা হইয়াছিল। বিলটি লইয়া পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে আগাইবার জন্য সিনেটে ট্রাম্পের প্রয়োজন ছিল ৬০টি ভোটের; কিন্তু পক্ষে-বিপক্ষে সমপরিমাণ ৪৭টি করিয়া ভোট পড়িবার দরুন বিলটি আটকাইয়া যায় সিনেটে। ইহাতে রিপাবলিকানরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন ডেমোক্র্যাটদের উপরে। তাহারা মনে করিতেছেন ডেমোক্র্যাটরা এই বিলের বিরোধিতা করিয়া এক অর্থে আগুন লইয়া খেলিতেছেন। বিরোধীদের আচরণ দায়িত্বহীন অজ্ঞের মতো; কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা মনে করিতেছেন, করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে লক্ষ আমেরিকান শ্রমিকের সুরক্ষা কিংবা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নয়নের এই বিলটিতে যথেষ্ট পরিকল্পনার ছাপ নাই। এইখানেই রহিয়াছে মার্কিন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সেইখানে প্রেসিডেন্ট চাহিলেই যাহা ইচ্ছা তাহা করিতে পারেন না। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে বিরোধীদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হইতেই হয় প্রেসিডেন্টকে।  ইহাই আমেরিকার গণতন্ত্রের চেক অ্যান্ড ব্যালান্স। যেমন কিছুদিন পূর্বে মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণের জন্য ট্রাম্পের চাহিদামতো ৫৭০ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয় নাই কংগ্রেস। ক্ষমতার এই ভারসাম্যই অতি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানকেও নত হইতে শেখায়।

রাষ্ট্রের নিজস্ব বৃত্তে যেই অমিয় ক্ষমতা রহিয়াছে, উন্নত বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রনায়করা তাহার অপব্যবহার করিলে তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়িতেই হয়। এক কথায়, উন্নত দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা চাহিলেও অনুন্নত দেশসমূহের ক্ষমতাসীনদের মতো ক্ষমতাকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করিতে পারেন না। তাহার তিলমাত্র চেষ্টা করিলে কিংবা কোনো অঘটন ঘটিলে কী হইতে পারে, তাহার উদাহরণের শেষ নাই, মাত্রই কিছুদিন পূর্বে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক রাষ্ট্রনায়ক প্রেসিডেন্ট লি মাইং-বাককে ইহার খেসারত দিতে হইয়াছিল। একটি উন্নত দেশের রাজনৈতিক সৌন্দর্য ইহা। উন্নত বিশ্বে স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নতার পরাকাষ্ঠা হিসাবে রাষ্ট্রপ্রধানের যে ভাবমূর্তি জনতার মানসপটে তৈরি হয়, তাহার বিচ্যুতি অত্যন্ত অসম্মানের বটে। ইহা একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিও। উন্নত দেশমাত্রই এই সৌন্দর্যের অধিকারী। কিংবা ঘুরাইয়া বলা যায়, এই সৌন্দর্যের অধিকারী না হইলে একটি দেশ উন্নত হইতে পারে না।